সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) নতুন পরিপত্র জারি করেছে।
সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)’র দরপত্র ব্যবস্থাপনায় অস্বাভাবিকভাবে কম দর প্রদানের প্রবণতা রোধে এ নতুন পরিপত্র জারি করা হয়।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, যদি কোনো দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কম বলে প্রতীয়মান হয়, তবে সেই দরদাতার কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
একই সঙ্গে তার আর্থিক সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও কাজ বাস্তবায়নের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।
এর মাধ্যমে শুধু কম দামের ভিত্তিতে কাজ প্রদান না করে, সামগ্রিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ক্রয় কার্যক্রমে অনেক সময় দরদাতারা অস্বাভাবিকভাবে কম মূল্য উল্লেখ করে দরপত্র জমা দেন।
এর ফলে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, নিম্নমানের কাজ কিংবা অতিরিক্ত ব্যয়ের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
বিশেষ করে নির্মাণ ও অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোতে এই ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিপত্রে আরও বলা হয়, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে হলে ‘সিগনিফিকেন্টলী লো প্রাইস টেন্ডার’ বা অত্যন্ত কম মূল্যের দরপত্র সম্পর্কে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
কারণ অনেক সময় কিছু প্রতিষ্ঠান কম দর দেখিয়ে কাজ গ্রহণ করলেও, পরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে জনস্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে অস্বাভাবিক কম দর দেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা।
অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প পাওয়ার আশায় বাস্তবতার তুলনায় কম দর প্রস্তাব করে থাকে।
পরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তারা কাজের গতি কমিয়ে দেয় অথবা অতিরিক্ত ব্যয়ের আবেদন করে।
ফলে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায় এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না।
বিপিপিএ’র নতুন নির্দেশনা এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জানা যায়, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য বর্তমানে ই-জিপি বা ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট পদ্ধতি চালু রয়েছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে দরপত্র আহ্বান, জমা ও মূল্যায়নের কাজ সম্পন্ন হয়। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার মধ্যেও কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কৌশলে অস্বাভাবিক কম দর দিয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টা করে।
নতুন পরিপত্রে এসব বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
পরিপত্রে সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে কোনো দরদাতার মূল্য যদি বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত কম হয়, তাহলে তা যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করা যাবে না।
প্রয়োজনে দরদাতার কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা নিতে হবে এবং বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিপিপিএ’র এই উদ্যোগকে একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, এই নির্দেশনার ফলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রকৃত যোগ্য ও দক্ষ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহিত হবে।
যারা সঠিক মূল্য নির্ধারণ করে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ করতে আগ্রহী, তারা ভবিষ্যতে আরও বেশি সুযোগ পাবে।
একই সঙ্গে অসাধু ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা থেকে ধীরে ধীরে ছিটকে পড়বে।