২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে বিক্রি করতে না পেরে পশুর চামড়া রাস্তায় রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। যার প্রভাবে এবার পুরোনো অনেকে চামড়া নিয়েই আসেনি চট্টগ্রামের আতুরার ডিপোর চামড়ার আড়তে। যা এসেছে তাও অল্প দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
আবার আড়তগুলোতে চামড়া সংরক্ষণের কাজ করার আশায় আসা অনেক শ্রমিক ফিরে গেছেন খালি হাতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর লোকসান দেওয়ায় এবার অনেকে আড়তে চামড়া নিয়ে আসেনি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর আতুরার ডিপো কাঁচা চামড়ার আড়তগুলোতে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করছেন শ্রমিকরা। ট্রাকে পিকআপ ও চাঁদের গাড়িতে করে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা চামড়া সংগ্রহ করে আড়তগুলোতে লবণজাত করা হচ্ছে। তবে গত বছরগুলোর চেয়ে এবার চামড়া কম এসেছে বলে দাবি অনেকের।
‘আমরা মাদরাসার জন্য কিছু চামড়া সংগ্রহ করেছি। এলাকার কোরবানিদাতা অনেকে মাদরাসার এতিমখানার মিসকিন ফান্ডে চামড়াগুলো দান করেছেন। ২৯টি চামড়া পেয়েছি আমরা। চামড়াগুলো এখানে (আতুরার ডিপো) আনতে আড়াই হাজার টাকা গাড়িভাড়া খরচ হয়েছে। কেউ ৮০ টাকা, কেউ ৯০ টাকায় কিনতে চাইছে। অনেক অপেক্ষার পর একজনের কাছে ২৯টি চামড়া ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। অথচ এখানে প্রায় সবগুলো লাখ, দেড় লাখ, দুই লাখ টাকা দামে কেনা গরুর চামড়া।’—মাওলানা মো. আলী, হাটহাজারীর একটি মাদরাসার পরিচালক
সোমবার (২৮ মে) রাত ৮টার দিকে স্থানীয় বয়োজ্যৈষ্ঠ শফিকুর রহমান বলেন, অন্যবছরগুলোতে এখানে চামড়া নিয়ে আসার গাড়ির জ্যাম লেগে যেত। এবার রাস্তা একেবারে ফাঁকা। যে চামড়াগুলো আসছে তাও কম দামে কিনছে আড়তদাররা।
শফিকুর রহমানের পাশেই ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থানীয় যুবক মো. দিদার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি প্রতিবছর কোরবানির দিন চামড়া সংরক্ষণ কাজ করি। এবার কাজ একেবারে কম। তাই অপেক্ষা করছি।’
চলছে চামড়া সংগ্রহ
কক্সবাজারের পেকুয়া থেকে প্রতিবছর আতুরার ডিপোর আড়তগুলোতে কাজ করতে আসেন বেশ কয়েকজন যুবক। এবারও ১৫জন এসেছেন। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত তারা কোনো কাজ পাননি। তাদের একজন হুমায়ুন কবির। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা গত ৪ বছর ধরে কোরবানির দিন এখানে কাজ করতে আসি। একদিন রাতসহ কাজ করলে তিন-চার হাজার টাকা পাইতাম। এবার দেখি কেউ কাজে নিচ্ছে না। আগের বছরগুলোর চেয়ে চামড়া কম এসেছে। তাই শ্রমিকের চাহিদা কম। এখন গাড়িভাড়াগুলোও লস।’
হাটহাজারীর মাদরাসা বাড়িঘোনা জমিরিয়া তাজবিদুল কোরআন হেফজ ও এতিমখানার পরিচালক মাওলানা মো. আলী বলেন, ‘আমরা মাদরাসার জন্য কিছু চামড়া সংগ্রহ করেছি। এলাকার কোরবানিদাতা অনেকে মাদরাসার এতিমখানার মিসকিন ফান্ডে চামড়াগুলো দান করেছেন। ২৯টি চামড়া পেয়েছি আমরা। চামড়াগুলো এখানে (আতুরার ডিপো) আনতে আড়াই হাজার টাকা গাড়িভাড়া খরচ হয়েছে। কেউ ৮০ টাকা, কেউ ৯০ টাকায় কিনতে চাইছে। অনেক অপেক্ষার পর একজনের কাছে ২৯টি চামড়া তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। অথচ এখানে প্রায় সবগুলো লাখ, দেড় লাখ, দুই লাখ টাকা দামে কেনা গরুর চামড়া।’
তিনি বলেন, ‘কোরবানিদাতারা সওয়াবের উদ্দেশ্যে মিসকিন ফান্ডে দান করেছেন। চামড়াগুলো গ্রাম থেকে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী ও ছাত্ররা ভ্যানে করে মাদরাসায় এনেছে। ওখান থেকে গাড়িতে করে আতুরার ডিপো এনেছি। এখন চামড়ার দামের চেয়ে আমাদের গাড়ি ভাড়া আরও বেশি খরচ হয়েছে। আমরা যারা সারাদিন এসব চামড়া নিয়ে কাজ করেছি সবই বৃথা।’
‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে প্রায় দেড় লাখের মতো চামড়া আসবে। আড়তে চামড়া কম এসেছে কি না, তা এখন অনুমান করার সুযোগ নেই। আমরা সবাই চামড়া নিয়ে ব্যস্ত আছি।’—মো. মুসলিম উদ্দিন, সভাপতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড
আরেক মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আলাউদ্দিন বলেন, আগের চামড়ার দাম বেশি ছিল কিন্তু চামড়াজাত পণ্যের দাম কম ছিল। এখন সময়ের ব্যবধানে চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে কিন্তু কাঁচা চামড়ার কোনো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। সবই সিন্ডিকেটের কারসাজি। অথচ সরকার বলছে, দেশে সিন্ডিকেট নেই। এবার চামড়ার দামও গত বছরের চেয়ে বাড়িয়েছে। কিন্তু আড়তগুলো আরও কম দামে চামড়া খরিদ করতে চাইছে।
স্তূপ করে রাখা কাঁচা চামড়া
খাগড়াছড়ির রামগড় এলাকা থেকে একটি মাদরাসার ৬০০টির মতো চামড়া নিয়ে আসা হয় আতুরার ডিপোতে। মো. করিম নামের একজন বলেন, ‘আমরা চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে পারি না। তাই আতুরার ডিপোতে নিয়ে এসেছি। এখানে ১০০ টাকার বেশি কেউ দাম দিতে চাইছে না।’
তবে আড়তগুলোতে পর্যাপ্ত চামড়া সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে প্রায় দেড় লাখের মতো চামড়া আসবে। আড়তে চামড়া কম এসেছে কি না, তা এখন অনুমান করার সুযোগ নেই। আমরা সবাই চামড়া নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ স্বাভাবিকভাবেই চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, আতুরার ডিপো বাদেও নগরীর চাক্তাই, বাকলিয়া, মাঝিরঘাট, হালিশহর, পতেঙ্গা, নাছিরাবাদ শিল্প এলাকা, সাগরিকা শিল্প এলাকায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা লবণযুক্ত চামড়া সংরক্ষণ করেন। ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে এসব চামড়া বিক্রি করে দেন তারা।
নগরীর বাইরেও উপজেলা পর্যায়ে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা অস্থায়ী সামিয়ানা তৈরি করে চামড়া লবণ নিয়ে সংরক্ষণ করেন। অন্যদিকে, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহ করে চামড়া নিয়ে আসেন আতুরার ডিপো এলাকায়।