আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সংঘাতের কালো মেঘ কেটে যাওয়ার আভাসে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির জোরালো আশাবাদ তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বাজার শান্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বড় বড় শেয়ারবাজারগুলোতেও ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনা সরাসরি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক নতুন আশার আলো ও উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
শুক্রবার বৈশ্বিক তেলের দামের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গিয়ে প্রতি ব্যারেল ৯১ দশমিক ৫৪ ডলারে নেমে এসেছে। চলতি মে মাসের শুরুর দিক থেকে হিসাব করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুডের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় দরপতন হিসেবে বিবেচনা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বাজারের বেঞ্চমার্ক ‘ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট’ বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ১ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৬৪ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেও এই তেলের দাম সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৭০ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ পদক্ষেপের পরই মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে এই ইতিবাচক হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট শান্তিচুক্তির খসড়া তৈরি করে তা মার্কিন মিত্র দেশগুলোর কাছে পাঠিয়েছেন। এরপর থেকেই বাজার পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান নিজেদের মধ্যে চলমান সংঘাত সাময়িকভাবে থামাতে আগামী ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে একটি প্রাথমিক পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই খসড়া সমঝোতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো তার চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেননি। অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই পরিস্থিতির অগ্রগতি সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, চুক্তিটি এখনো সম্পূর্ণ চূড়ান্ত রূপ না পেলেও দুই দেশই সমঝোতার একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থান করছে।
বিগত প্রায় ৯০ দিন ধরে চলা এই বিধ্বংসী ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ও চরম অস্থিরতা তৈরি করেছিল। যুদ্ধের একপর্যায়ে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট ও চাপ তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির পারদকে উসকে দিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডয়চে ব্যাংকের প্রধান বিশ্লেষক হেনরি অ্যালেন অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে এখন সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটার ব্যাপারে জোরালো বিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। তেলের দামের এই ধারাবাহিক পতনের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা স্থবিরতা এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির যে বড় ঝুঁকি ছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে বলে মনে করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
জ্বালানি তেলের বাজার শান্ত হওয়ার এই ইতিবাচক প্রভাবে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে স্মরণকালের বড় ধরনের উত্থান লক্ষ করা গেছে। শুক্রবার জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ‘নিক্কেই’ একলাফে ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক ‘কসপি’ রেকর্ড ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও এই ঊর্ধ্বমুখী ও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।