২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা সিন্ডিকেট। একই সঙ্গে আপিলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শাস্তি পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হয়েছে।
গতকাল (সোমবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের কাউন্সিল কক্ষে প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিন্ডিকেট সভাপতি ও উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এসব সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করেন।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৪, ১৫ ও ১৭ জুলাই সংঘটিত ঘটনাগুলোর তদন্তে গঠিত তদন্ত ও কাঠামোবদ্ধ কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য বলেন, ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিতে প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং প্রমাণ যাচাই করা হয়েছে।’
সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হোসনে আরাকে সতর্ক করা হয়েছে।
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইসরাফিল আহমেদ রঙ্গনের বেতন তার বর্তমান পদের প্রাথমিক স্কেলে নামিয়ে আনা হয়েছে।
একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রউফ শৈবালকে প্রভাষক পদে অবনমিত করা হয়েছে।
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নজমুল হাসান তালুকদারের দুটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয়েছে এবং তাকে নিম্নতর বেতন স্কেলে রাখা হয়েছে।
তবে ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম খোন্দকার, জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন সিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার খসরু পারভেজকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের দুটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয়েছে।
সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক আলমগীর কবিরের বেতন বর্তমান পদের প্রাথমিক স্কেলে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং তাকে পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুনকে সতর্ক করা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম ফিরোজ-উল-হাসানের বেতন প্রাথমিক স্কেলে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি দুই বছর পর পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য থাকবেন।
একইভাবে অধ্যাপক বশির আহমেদের বেতনও প্রাথমিক স্কেলে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করতে পারবেন এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবেন।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দিন সিকদারের বেতন প্রাথমিক স্কেলে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করতে পারবেন এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য থাকবেন।
সাবেক উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের বেতন গ্রেড-২-এ নামিয়ে আনা হয়েছে এবং তাকে পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এদের সবাই আওয়ামীপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার মধ্যে সহকারী রেজিস্ট্রার রাজীব চক্রবর্তীকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে উপ-রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে অবনমিত করা হয়েছে এবং তিনি দুই বছর পর পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
উপাচার্য আরও জানান, প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসায় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক শেখ মো. মনজুরুল হক এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদা আখতারের ভূমিকা তদন্তে তিনটি পৃথক কাঠামোবদ্ধ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া একই সময়ের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের ওপর আরোপিত শাস্তির বিরুদ্ধে করা আপিল পর্যালোচনা করে সিন্ডিকেট পূর্বের কয়েকটি সিদ্ধান্ত সংশোধন করেছে।
প্রাথমিকভাবে দুই বছরের জন্য বহিষ্কৃত আট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয়জনের বহিষ্কারের মেয়াদ কমানো হয়েছে। সনদ বাতিল-সংক্রান্ত কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, আবার কারও শাস্তি এক বছর বা দুই বছরের মেয়াদে সীমিত করা হয়েছে।
আপিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোট পাঁচ শিক্ষার্থীকে পূর্ববর্তী শাস্তি থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে সংশোধিত শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে। তবে কিছু স্থগিতাদেশ ও শাস্তিসহ কয়েকটি পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
উপাচার্য বলেন, চূড়ান্ত ফলাফলে কিছু ক্ষেত্রে অব্যাহতি এবং কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি বহাল রাখার মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। শিগগিরই নাম ও নির্দিষ্ট আদেশসহ মামলাভিত্তিক বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে।
এসব মামলায় জড়িত শিক্ষার্থীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে জাবি ক্যাম্পাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছিল।