যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবারও জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চুক্তি ঘোষণার পর শুক্রবারের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথটি পুনরায় চালু হওয়া, কয়েক মাসের প্রাণঘাতী সংঘাত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিরসনের পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর এই সংকটের সূচনা হয়েছিল।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্প সোমবার বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী থেকে তেলবোঝাই অনেক জাহাজ চলাচল শুরু করেছে।’
পরে তিনি আরও বলেন, এই নৌপথ খোলা রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘খুব বেশি সহায়তার প্রয়োজন হবে বলে মনে করি না।’
সোমবার সন্ধ্যায় ইরানের গণমাধ্যম জানায়, তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার ও পণ্যবাহী দুটি জাহাজ ওই এলাকা অতিক্রম করেছে, যা আগে মার্কিন নৌ অবরোধের আওতায় ছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে রাখে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে যাওয়া-আসার জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানায়, শান্তি চুক্তিটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষরিত হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ইতোমধ্যেই ইলেকট্রনিকভাবে চুক্তির পাঠে স্বাক্ষর করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে এতে স্বাক্ষর করতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি এই প্রক্রিয়াকে সফল পরিণতিতে পৌঁছানোর প্রতি তার অঙ্গীকার প্রদর্শন করতে চেয়েছেন।’
ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে চুক্তির পাঠ কবে প্রকাশ করা হবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দলিল। আমি চাই এটি প্রকাশ করা হোক। সম্ভবত খুব শিগগিরই।’
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, এই চুক্তির ফলে যুদ্ধের ‘তাৎক্ষণিক অবসান’ ঘটেছে। পাশাপাশি দুই মাসের মধ্যে একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ নিয়ে আলোচনা হবে।
ইরানের সামরিক বাহিনী এই সমঝোতাকে বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ‘অপমানিত’ করেছে। আর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একে অঞ্চলের জন্য ‘বড় অর্জন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস আমাদের আছে। চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার ইতিহাসও আছে। এসব বিষয় আমাদের মনে রয়েছে।’
-শর্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা-
চুক্তিটি কয়েক সপ্তাহের টানাপোড়েনপূর্ণ আলোচনা এবং নতুন করে সংঘাত শুরুর হুমকির পর এসেছে। তবে এর গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরানের মুখপাত্র বাকাই বলেন, ওয়াশিংটন বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের অর্থ ছাড় করতে ও যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।
এর আগে ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থা জানায়, আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করবে।
বাকাই আরও বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর তেহরান তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করবে।
তবে বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কারণ ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সমাপ্তি ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের বিষয়ে সমাধান চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গত বছরের হামলায় এসব মজুত ভূগর্ভে চাপা পড়ে গেছে।
ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করবে কি না, তা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, ১৫ বছরের মেয়াদেও তিনি রাজি হতে পারেন।
বাকাই জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ইরান টোল নয়, সামুদ্রিক সেবা ফি আদায় করবে।
চুক্তির ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ বহনকারী এই নৌপথ পুনরায় চালু হলে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ কমবে।
যুদ্ধ শুরুর পর ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১১০ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে গেলেও চুক্তির পর তা প্রায় ৫ শতাংশ কমে ৮০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে।