জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করা, হাইতিতে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট মোতায়েন, শান্তিরক্ষীদের পরিচালনাগত সহযোগিতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নারী শান্তিরক্ষীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্ট (ডিওএস)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল (ইউএসজি) অতুল খারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ কন্টিনজেন্টগুলোর পরিচালনাগত সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিপূরণ দ্রুতকরণ, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন, ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি (ডব্লিউপিএস)’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং হাইতিতে বাংলাদেশের বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট (এফপিইউ) মোতায়েনের প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যদের প্রতিপূরণ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সহজতর করতে ডিওএস-এর ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারেকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি শান্তিরক্ষা মিশনে সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে ডিওএস-এর পরিবেশ বিভাগের ভূমিকাও তিনি প্রশংসার সঙ্গে উল্লেখ করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জানান, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে জাতিসংঘের সহযোগিতায় মিশন এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। নারী শান্তিরক্ষীদের জন্য নিরাপদ, উপযোগী ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে জাতিসংঘকে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়াতে শান্তিরক্ষীদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
হাইতির চলমান নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ তিনটি অত্যাধুনিক বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব ইউনিটে সোয়াত (SWAT), র্যাপিড রেসপন্স প্ল্যাটুন, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ (ইওডি), ফরেনসিক ও ক্রাইম সিন ব্যবস্থাপনা, সংগঠিত অপরাধ ও সাইবার অপরাধ তদন্ত, নৌ-কার্যক্রম এবং মাদকবিরোধী অভিযানে প্রশিক্ষিত সদস্যরা থাকবেন।
হাইতিতে এই বিশেষায়িত সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহারের জন্য জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও তুলে ধরেন তিনি। এ বিষয়ে আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ পুলিশের তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেবে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি আলোচনাকে সফল করতে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, পূর্ণাঙ্গ ফর্মড পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের পাশাপাশি অন্যান্য পুলিশ অবদানকারী দেশের (পিসিসি) স্বনির্ভর ইউনিটের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ টিম বা প্ল্যাটুন মোতায়েনের জন্যও বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীল পতাকার অধীনে বাংলাদেশের অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং জাতিসংঘের লজিস্টিক সহায়তার সমন্বয়ে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।
বৈঠকে আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকারও উচ্চ প্রশংসা করেন।
হাইতিতে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট মোতায়েনসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে অতুল খারে বলেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এই বৈঠককে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূমিকা আরও সম্প্রসারণ, হাইতিতে বিশেষায়িত পুলিশ মোতায়েনের অগ্রগতি এবং পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক শান্তিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।