টানা ১৫ বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শাসনের ইতি টেনে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। সরকার পরিবর্তনের পাঁচ মাস পার হলেও, নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ফলে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে গভীর হতাশা। শিল্পায়ন থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা—সবক্ষেত্রেই নতুন সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
শিল্পের প্রসারে বাধা হিসেবে রাজ্য সরকার দীর্ঘদিনের বকেয়া ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা বলছে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, প্রায় ২০ হাজার কোটি রুপির বকেয়া মিটিয়ে নতুন শিল্প কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। এর পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণ নীতি নিয়ে অস্পষ্টতা এবং আইনি জটিলতা নতুন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহী করে তুলেছে।
রাজ্য সরকারের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বড় ধরনের ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ফুটপাত ও রেলের জমি থেকে হকারদের কোনো প্রকার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই উচ্ছেদ করায় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। দুর্গাপূজার ঠিক আগে দোকান খালি হয়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন গভীর সংকটে। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের উপস্থিতিতে এক নারীকে পুনর্বাসন ছাড়াই উচ্ছেদের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অমানবিকতার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই নারীকে সাহায্য করার কথা জানালেও, সেই নারী নিজেই অভিযোগ তুলেছেন যে এখন ভাড়ার দায়ভার তার ওপরই চাপানো হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা এবং অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণের নামে চলা অভিযানের কারণে বহু সাধারণ বৈধ নাগরিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সুবিধার্থে তড়িঘড়ি জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়াকেও সাধারণ মানুষ সন্দেহের চোখে দেখছে। বিভিন্ন এলাকায় বিজেপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের হুমকি দেওয়া এবং সিন্ডিকেট চালিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগও সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছে। প্রভাবশালী বিধায়কদের বিরুদ্ধে তোলা না পেয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অভিযোগ উঠছে। ধর্মীয় নেতাদের বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে, যেখানে বাঙালিকে ‘পাপী’ আখ্যা দেওয়ার মতো মন্তব্য করা হয়েছে। যদিও পরে সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ও মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এ নিয়ে সাফাই দিয়েছেন, তবে এর রেশ কাটেনি। উত্তর কলকাতার এক মুসলিমপ্রধান এলাকায় মাসের পর মাস পানি বন্ধ করে রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও খবরের শিরোনাম হয়েছে।
শিক্ষা ও ঐতিহ্যের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও বিতর্ক তুঙ্গে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম বদল ও গেরুয়াকরণের চেষ্টার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ৯ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ‘গেরুয়া সম্মানযাত্রা’য় নাগা সাধুদের অংশগ্রহণের দৃশ্যটি কলকাতা তথা রাজ্যের মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। মুখ্যমন্ত্রী যাদবপুরে দাঁড়িয়ে পুনরায় বেদ পাঠ ও হনুমান চালিশা পাঠের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যা অনেকের কাছেই ক্ষমতার ঔদ্ধত্য বলে মনে হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনেও আগ্রাসী ভাষা ও ‘লাঠি থেরাপি’র মতো হুমকির ব্যবহার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করেছে। অনাথবন্ধু নাথের মতো কট্টর বিজেপি সমর্থকরাও খোলাখুলিই বলছেন যে, নেতাদের এমন হঠকারী আচরণ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দলের মূল আদর্শের বড় ধরনের ক্ষতি করছে। শান্তি ও উন্নয়নের বদলে সমাজে হিংসার বাতাবরণ তৈরি হওয়ায় প্রত্যাশার জায়গায় এখন কেবল হতাশা ও অস্বস্তি দানা বেঁধেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি কলকাতার এক অভিজাত ক্লাবে শহরের এক বিশিষ্ট শিল্পপতির সঙ্গে নিভৃত আলাপচারিতা হচ্ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমন পরিস্থিতির জন্যই কি আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বস্তুত তাঁর এ হতাশার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে, যা গেরুয়া শিবিরের জনপ্রিয়তায় আঘাত হানার পক্ষে যথেষ্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু এরই মধ্যে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে গেরুয়া প্রশাসন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারে নানা ক্ষেত্রে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিজেপি নেতারা, সেসব বাস্তবায়িত হওয়া নিয়েও জনমানসে দেখা দিয়েছে সংশয়ের মেঘ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পূর্বতন তৃণমূল শাসনকালে শিল্পে সরকারি সুবিধা দেওয়ার নীতি কার্যকর না হওয়া এবং প্রায় ২০ হাজার কোটি রুপি বকেয়া মিটিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি করা যে অত্যন্ত জটিল, তা ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। চাকরির আরও তথ্য: অন্যদিকে টাটা গ্রুপের শীর্ষ নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে রাজ্যে বড় মাপের বিনিয়োগের আশা আপাতত বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।