স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় এবং বিশ্ব পরিমণ্ডলে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করা। দীর্ঘ পাঁচ দশকের সেই যাত্রা পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক এই সংস্থার সাথে বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিধি বিস্তৃত হয়েছে এবং দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৯-৮০ মেয়াদে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। পরবর্তীতে ২০০০-০১ মেয়াদে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত সক্রিয়। আশির দশকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে গৃহীত উদ্যোগগুলো ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এছাড়া, ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্বশান্তি রক্ষায় দেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করে। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জন্য বড় এক অর্জনের ঘটনা ঘটে গত ২৬ জুন ২০২৬ তারিখে। সেদিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান। এই নির্বাচনে তিনি গোপন ব্যালটে ৯৯টি ভোট পান, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকুরিস পেয়েছিলেন ৯১টি ভোট। মোট ১৯০টি ব্যালটের মধ্যে কোনো ভোট বাতিল বা বিরত ছিল না, যা এই জয়কে অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং ড. খলিলুর রহমান এক বছর মেয়াদে এই বৈশ্বিক সংস্থায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর এই কার্যকালের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘বিশ্বাস পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। নিজের এই নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ড. খলিলুর রহমান তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া এবং প্রচারণায় সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই উদ্বোধনী ভাষণে তিনি জাতিসংঘের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন এবং ভেঙে পড়া বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর জোরালো গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত মর্যাদাশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান। এটি বাংলাদেশের জন্য বড় একটি কূটনৈতিক সূচনাবিন্দু হলেও, এটিকে দেশের সামগ্রিক সফলতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক সরকারের সামনে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনীতি এখন এক বড় পরীক্ষার সম্মুখীন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনশীল সমীকরণ সামলানো এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের জন্য প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কঠিন সময়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান কীভাবে আরও দৃঢ় করা যায়, তা নিয়েই এখন চলছে নানা সমীকরণ ও পরিকল্পনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে বর্তমান বিশ্ব আগের তুলনায় অনেক বেশি বিভক্ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ভারত-চীন সমীকরণ, রোহিঙ্গা সংকট, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে একাধিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একদিকে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার বলয়ের অন্যদিকে অবস্থানের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াতেও ভারত, চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে সম্পর্কের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্ব, জোটনিরপেক্ষ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণ পায় গুরুত্ব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাতিসংঘের সরকারি নথিতেও বাংলাদেশের এই দুই মেয়াদের সদস্যপদ উল্লেখ রয়েছে।