২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান এবং জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াইয়ের। রাসায়নিক অণুর ‘মিরর ইমেজ’ বা দর্পণ প্রতিবিম্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এবং অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার ইফেক্ট ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের এই সম্মাননা দেওয়া হয়। আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিকস নিয়ে তাঁদের আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। মহাবিশ্বের দূরবর্তী স্থান থেকে পৃথিবীতে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
রসায়নশাস্ত্রে দর্পণ-রূপ বা মিরর ইমেজ নিয়ে দীর্ঘদিন রহস্য ছিল। কিছু অণুর দুটি রূপ থাকে, যা দেখতে হুবহু আয়না-ছবির মতো। তবে জীবজগতে সাধারণত একটি রূপই বেশি কার্যকর। ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি অণুর ভিন্ন দর্পণ-রূপ মানবদেহে ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল এমন বিক্রিয়া পদ্ধতি আবিষ্কার করা, যেখানে নির্দিষ্ট একটি রূপ নির্ভুলভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়। এই সমস্যার সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা এমন রাসায়নিক বিক্রিয়ার সন্ধান করে আসছিলেন, যার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত একটি দর্পণ-রূপ বেশি পরিমাণে বা নির্দিষ্টভাবে তৈরি করা সম্ভব।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদের হেনরি কাগান ১৯৮৬ সালে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা নির্দিষ্ট দর্পণ-রূপ তৈরিতে সহায়ক ছিল। পরবর্তীতে টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই এই গবেষণায় আমূল পরিবর্তন আনেন। ১৯৯৫ সালে তিনি একটি নতুন নকশা উপস্থাপন করেন এবং ২০০৩ সালে এমন একটি বিক্রিয়া প্রদর্শন করেন, যেখানে সম্ভাব্য দুটি রূপের পরিবর্তে একটিই তৈরি হয়। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, জীবনের নিজস্ব প্রক্রিয়ার বাইরে এমন ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি।
নোবেল কমিটির প্রধান হাইনার লিংকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, স্বতঃস্ফূর্ত হোমোকাইরালিটির উদ্ভব শত বছর ধরে রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কাগান ও সোয়াইয়ের উদ্ভাবনী বিক্রিয়াগুলো এই জটিল রহস্যের সমাধান ঘটিয়েছে। ওষুধের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে তাদের এই গবেষণা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
নোবেল পুরস্কারের প্রথা অনুযায়ী বিজয়ীরা একটি ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলার অর্থ পেয়ে থাকেন। একাধিক বিজয়ী থাকলে এই অর্থ সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়। ১৯০১ সাল থেকে মানবতার কল্যাণে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মোট ১১৭ বার রসায়নশাস্ত্রে নোবেল দেওয়া হয়েছে এবং মোট ১৯৮ জন ব্যক্তি এই সম্মান পেয়েছেন। এই তালিকার মধ্যে যুক্তরাজ্যের ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি শার্পলেস দুবার করে নোবেল জয় করেছেন।
উল্লেখ্য, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস’ নিয়ে কাজের জন্য রসায়নে নোবেল পান সুসুম কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন এবং ওমর এম. ইয়াঘি।
এ বছরের নোবেল ঘোষণা শুরু হয় ৫ অক্টোবর থেকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল। পদার্থবিজ্ঞানে এই গৌরব অর্জন করেছেন ফ্রান্সিস হালজেন।
আগামীতে সাহিত্যের পুরস্কার বৃহস্পতিবার এবং শান্তির পুরস্কার শুক্রবার ঘোষণা করা হবে। অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীর নাম জানা যাবে ১৩ অক্টোবর। আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছানুসারে পরিচালিত এই পুরস্কার বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে উৎসাহিত করে আসছে। পুরস্কারটি প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়।