1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৬ অপরাহ্ন

ইরানের সরকার উৎখাতে নেতানিয়াহুর লক্ষ্য: কতটা কার্যকর পরিকল্পনা?

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইরানের বিদ্যমান সরকার উৎখাতকে দেশটির জন্য প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে যথেষ্ট সংশয়ের চোখে দেখছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের ভেতরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধনের মতো সামরিক সক্ষমতা ইসরাইলের থাকলেও, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের মতো কার্যকর কৌশল তাদের নেই। কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন তারা। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী স্থল অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে, যা ইসরাইলের বর্তমান সামর্থ্যের চেয়েও বেশি বড় ধরনের সামরিক প্রতিশ্রুতির দাবি রাখে।

নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে জনমত জরিপে সমর্থন হারানোর চাপে থাকা অবস্থায় নেতানিয়াহু এমন বক্তব্য দিলেন। রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রধান পিট হেগসেথের ইসরাইল সফরের পরপরই এই অবস্থান জানান তিনি। তবে ইরানে নতুন কোনো অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আবার এই ধরনের ক্ষমতা পরিবর্তনের অভিযানে ওয়াশিংটন কোনো নিশ্চয়তা দেবে কি না, সেটিও এখনো অজানা। ইরানকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার বিশ্বাসযোগ্য পথ এখনো খুঁজে পায়নি ওয়াশিংটন। সিএনএন কুর্দি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানায়। একই সঙ্গে মার্কিন স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটানো এড়িয়ে চলতে পারে তেহরান। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রও এমন আরেকটি সরকার পরিবর্তনের অভিযানে জড়াবে না, যা বাস্তবায়নে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক আরবান কনিংহাম আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ইসরাইলের হাতে থাকা আক্রমণাত্মক অস্ত্রের ভাণ্ডার এবং আকাশে জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘ সময় উড্ডয়ন সক্ষমতা তাদের কিছুটা বাড়তি সুবিধা দেয়। এর মাধ্যমে তারা আকাশপথে আধিপত্য বজায় রেখে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানতে সক্ষম। তবে সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া আর একটি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

নেতানিয়াহুর ইরানবিরোধী অবস্থানের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় থেকেই তিনি দেশটির শাসনব্যবস্থাকে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে তিনি ইরানকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক শাসনব্যবস্থাগুলোর অন্যতম হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, দেশটিতে কঠোর স্বৈরশাসনের সঙ্গে উগ্র মতাদর্শের এক ভয়ঙ্কর সমন্বয় ঘটেছে। তিন দশক পর এসে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি সামনে আনলেও, আগের অভিজ্ঞতাগুলো খুব একটা ইতিবাচক নয়। ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও ইরানের সরকার উৎখাত করা সম্ভব হয়নি। তাই অভিযানে কতটা বাস্তব সামরিক সাফল্য পাওয়া যাবে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

আকাশপথের সীমাবদ্ধতা খোদ নেতানিয়াহু নিজেও স্বীকার করেছেন। গত মার্চ মাসে তিনি বলেছিলেন, শুধুমাত্র আকাশপথে হামলা চালিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এর সঙ্গে স্থল যুদ্ধের সমন্বয় প্রয়োজন। তবে সেই কঠিন অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে বা তার রূপরেখা কী, তা তিনি বিস্তারিত জানাননি। তুরস্কের কায়সেরির আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জাগলার কুরচ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিমান হামলায় হয়তো ইরানের সামরিক শক্তি কিছুটা দুর্বল করা যাবে, কিন্তু পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হবে না। দেশটির অনেক সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র এখনো গোপন ও সুরক্ষিত স্থানে রাখা আছে, যা টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ধরনের অস্ত্র তুলনামূলক সহজে তৈরি করা যায়।

কুরচের মতে, কোনো সরকার উৎখাত করতে হলে স্থলসেনা পাঠিয়ে সেখানে বছরের পর বছর অবস্থান করার মতো প্রস্তুতি থাকতে হয়। কনিংহামের মতে, গোয়েন্দা তৎপরতায় ব্যবহৃত নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহার করার পর বিসর্জন দেওয়ার মতো, কারণ একবার কাজে লাগালেই সেগুলো ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যদিও ইসরাইলের কিছু মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এখনো কার্যকর আছে বলে ধারণা করা হয়, তবে সাইবার হামলাসহ প্রতিটি কৌশলেরই নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা, কারণ বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান এরই মধ্যে দুই দফা হামলা মোকাবিলা করেছে। অন্যদিকে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সহায়তা করবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা। পরে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলো শনাক্ত করে ভেঙে দিতে পারে। মার্চে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাদের মতে, তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক স্বার্থে পার্থক্য রয়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটনকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো ছাড়াই ইসরাইলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে নতুন হামলার ক্ষেত্রে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বাধা সামরিক শক্তির ঘাটতি নয়; বরং সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার বাস্তবসম্মত পথের অভাব।

ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রসঙ্গে আরইউএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল জানান, ইসরাইলের সমান সংখ্যক যুদ্ধবিমান না থাকলেও ইরান সংঘাতকে বেশ ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে। দেশটির হাতে থাকা বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র বড় হুমকি। এছাড়া, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য প্রাকৃতিক দুর্গ হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও প্রচণ্ড চাপ পড়বে, কারণ ইরানের সস্তা ড্রোনগুলোর মোকাবিলায় তাদের অনেক বেশি ব্যয়বহুল মিসাইল খরচ করতে হচ্ছে। পুরোনো চীনা প্রযুক্তির জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশের উৎপাদন সক্ষমতাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আঘাত হানা ইসরাইলের জন্য প্রায় অসম্ভব।

বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ বাংকার বাস্টার বোমাগুলো এক্ষেত্রে অপরিহার্য।

২০২৫ সালের জুনে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমানের মাধ্যমে এসব বোমা নাতাঞ্জ ও ফোরদোর পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যবহৃত হয়েছিল।

বর্তমানে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপে থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর ইঙ্গিত রয়েছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে হামলার একটি প্রস্তাব ট্রাম্প নাকচ করে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ইসরাইল যদি একতরফা কোনো বড় অভিযানে নামে, তবে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলকেই মূল লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun