1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জনক

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এমন এক নাম, যাঁকে ঘিরে কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন পরিচয় নির্মাণের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন একাধারে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠক, রাষ্ট্রপতি, রাজনৈতিক সংগঠক এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের অন্যতম স্থপতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে ভঙ্গুর, অস্থির ও অনিশ্চিত রাষ্ট্র বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, সেই বাস্তবতার ভেতরে দাঁড়িয়ে তিনি রাষ্ট্রকে নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সময়কাল দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু তাঁর প্রভাব ছিল গভীর, বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কার্যত এক বিধ্বস্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধের ক্ষত তখনও তাজা। অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত, প্রশাসন অকার্যকর, শিল্পকারখানা অচল, কৃষি উৎপাদন বিপর্যস্ত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্ভিক্ষ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ। এই সংকটের ভেতরে বাংলাদেশের জনগণের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল এমন একটি নেতৃত্ব, যারা রাষ্ট্রকে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, আদর্শ আর বাস্তববাদী পরিকল্পনা দিয়ে পুনর্গঠন করতে পারবে। সেই প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উত্থান ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীতে জন্ম নেওয়া জিয়াউর রহমানের বেড়ে ওঠা ছিল এক স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবেশে। তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি দ্রুতই একজন দক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ তাঁর সামরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা এনে দেয়। তবে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা তাঁকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আরও সচেতন করে তোলে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধই তাঁর জীবনকে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে তিনি বিদ্রোহ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি সারা দেশের মানুষের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। সেই সময় দেশের মানুষ যখন আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল সাহস ও আত্মবিশ্বাসের আহ্বান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং “জেড ফোর্স” গঠন করেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত একাধিক সামরিক অভিযান মুক্তিযুদ্ধের গতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি শুধু পরিকল্পনাকারী ছিলেন না; সম্মুখযুদ্ধেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ কারণেই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতি দ্রুতই জটিল ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তববাদ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর প্রশাসন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন। দুর্বল হয়ে পড়া আমলাতন্ত্রকে কার্যকর করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অর্থনীতিকে সচল করার জন্য তিনি ধারাবাহিক উদ্যোগ নেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন ঘটে। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়েছিল এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন এবং নির্বাচনী রাজনীতিকে পুনরায় সক্রিয় করেন। সংবাদপত্র, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্র তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই তিনি “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণা সামনে আনেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় কেবল ভাষাভিত্তিক নয়; বরং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সার্বভৌম স্বার্থের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে। এই দর্শন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আদর্শিক ধারা তৈরি করে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্ত এবং জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নে সচেতন জনগণের মধ্যে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর এই রাজনৈতিক দর্শন ছিল রাষ্ট্রকে নতুন আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা।

১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিতে পারবে। সাবেক আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, কৃষক প্রতিনিধি, পেশাজীবী এবং আঞ্চলিক নেতাদের একত্র করে তিনি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে শহরকেন্দ্রিক রাখেননি; তিনি গ্রামবাংলাকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি গ্রামে। তাই গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, খাল খনন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। “গ্রাম সরকার” ধারণার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তাঁর সময়কার এসব উদ্যোগ পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হয়।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা তিনি দ্রুতই উপলব্ধি করেন। তাই তিনি ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে শুরু করেন। শিল্পনীতি পুনর্বিন্যাস, উদ্যোক্তা তৈরি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁর সময়েই শুরু হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প যে বৈশ্বিক অবস্থানে পৌঁছায়, তার নীতিগত ভিত্তির সূচনা হয়েছিল এই সময়েই।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, তার ভিত্তি নির্মাণেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হতে শুরু করে। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কাজের সুযোগ পান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ তৈরি হয়। পরবর্তীকালে এই রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।

পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন। মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা দেশ, চীন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি বাস্তববাদী কৌশল অনুসরণ করেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক প্রতিষ্ঠার ধারণা বাস্তব আলোচনায় আসে তাঁর সময়েই। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। শীতল যুদ্ধের বিভক্ত বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি আত্মবিশ্বাসী ও কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ খালেদ ইবনে আবদুল আজিজ বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় জিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতও তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং তাঁকে মুসলিম বিশ্বের একজন সাহসী নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর শুরুতে সম্পর্ক জটিল থাকলেও তাঁর সময়েই দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত উন্নত হয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন। ওয়াশিংটন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় তাঁর ভূমিকার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে “প্র্যাগম্যাটিক লিডার” বা বাস্তববাদী নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছিল। কারণ তিনি আদর্শিক সংঘাতের চেয়ে রাষ্ট্রীয় কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

ভারতের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল বাস্তবতানির্ভর। স্বাধীনতার আবেগঘন সম্পর্ককে তিনি কৌশলগত ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি থাকা প্রয়োজন এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনধারাও তাঁকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তিনি ছিলেন সংযমী, সময়নিষ্ঠ এবং কর্মমুখী নেতা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও সাধারণত তাঁর ব্যক্তিগত সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি মাঠপর্যায়ে ঘুরে মানুষের সমস্যা শোনার চেষ্টা করতেন। তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি ছিল জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষ যে হতাশা ও অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত ছিল, তিনি সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। তিনি জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বাংলাদেশ শুধু টিকে থাকবে না; বরং আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাবে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যদের ষড়যন্ত্রে তাঁর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমাপ্তি ছিল না; বরং একটি রাষ্ট্রীয় দর্শনের আকস্মিক বিরতিও ছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর প্রতিক্রিয়া আসে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক শোক প্রকাশ করেন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে।

আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বহুদলীয় রাজনীতি, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারা, রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সময়কার সিদ্ধান্তগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দৃশ্যমান। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক নেতা এসেছেন, কিন্তু সবাই রাষ্ট্রের চরিত্রে স্থায়ী ছাপ রাখতে পারেননি। জিয়াউর রহমান সেই বিরল নেতাদের একজন, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসিকতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তববাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তিনি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সময়কাল ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত সময়েই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, জাতীয়তাবাদ এবং পররাষ্ট্রনীতির এমন কিছু ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, যার প্রভাব এখনও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় দৃশ্যমান। সেই কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী এবং ঐতিহাসিকভাবে অপরিহার্য নাম।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান-কে ঘিরে যে আলোচনা, তা শুধু দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর মৃত্যু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক বিদ্রোহে তাঁর হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশের পর বিশ্বের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশকে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। কারণ জিয়াউর রহমান তখন শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও একটি রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা একজন নেতা।

বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি উঠে আসে তিনটি বিষয়—তাঁর ব্যক্তিগত সততা, রাজনৈতিক বাস্তববাদ এবং অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা। ইউরোপীয় সংবাদপত্রগুলো তাঁকে “পরিশ্রমী”, “শৃঙ্খলাবদ্ধ” এবং “বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়ক” হিসেবে বর্ণনা করেছিল। বিশেষ করে তাঁর মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণে যে বিষয়টি বারবার উঠে আসে, সেটি হলো—বাংলাদেশ এমন এক নেতাকে হারাল, যিনি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছিলেন।

স্পেনের প্রভাবশালী দৈনিক এল পাইস তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জিয়াউর রহমানকে “ক্যারিশমা ও কঠোর পরিশ্রমের এক বিরল সমন্বয়” বলে উল্লেখ করে। পত্রিকাটি লিখেছিল, তিনি ছিলেন “অবিরাম পরিশ্রমী” একজন নেতা, যিনি দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক শৃঙ্খলার মতো কঠোর মনোযোগ দিতেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সংসদ, নতুন রাজনৈতিক কাঠামো এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি গড়ে ওঠে।

একই সংবাদপত্র তাঁর হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে লিখেছিল, জিয়াউর রহমানের মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধাক্কা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁর মৃত্যুর পর ঢাকার রাজপথে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমও ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট তাঁর জানাজা ও দাফন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লিখেছিল, লাখো মানুষ ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে এবং মানুষের আবেগপূর্ণ উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি কতটা গভীর প্রভাব রেখে গেছেন। পত্রিকাটি উল্লেখ করে যে, মানুষের ঢল সামাল দিতে সেনাবাহিনীর সহায়তা পর্যন্ত নিতে হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ইউপিআই তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, তিনি দরিদ্র বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিনিধি কাস্তুরি রঙ্গন তাঁর হত্যাকাণ্ড নিয়ে লিখেছিলেন, জিয়াউর রহমান এমন এক নেতা ছিলেন, যিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুকে “বাংলাদেশের জন্য গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুহূর্ত” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

পশ্চিমা কূটনৈতিক মহলেও তাঁর মৃত্যু উদ্বেগ তৈরি করেছিল। কারণ অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের কাছে জিয়াউর রহমান ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্বের প্রতীক। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছিল যে, তাঁর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব গণমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত সততার বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। বিদেশি সাংবাদিকদের অনেক প্রতিবেদনে তাঁকে “honest soldier-politician” বা সৎ সামরিক-রাজনীতিক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করতেন, তিনি এমন সময় ক্ষমতায় এসেছিলেন, যখন বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক দুর্নীতি, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় হতাশ ছিল। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যক্তিগত সংযম ও কঠোর পরিশ্রম জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনে।

মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যমগুলোও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে। কারণ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত-সহ বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় তাঁকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সেতুবন্ধনকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাঁর সময়েই বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দরজা ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হতে শুরু করে, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

চীন ও পশ্চিমা বিশ্ব—উভয় পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে তাঁর মৃত্যু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে শুধু একটি রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হয়েছিল।

তাঁর মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণে আরেকটি বিষয় উঠে আসে—বাংলাদেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো লিখেছিল, জিয়াউর রহমান একদিকে সামরিক পটভূমি থেকে উঠে এলেও, অন্যদিকে তিনি বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি তখন দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছিল এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন জাতীয়তাবাদী ধারা তৈরি করেছিল।

বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বিস্মিত করেছিল। বিদেশি সাংবাদিকরা লক্ষ্য করেছিলেন, শহরের রাজনৈতিক অভিজাত বলয়ের বাইরে গিয়ে তিনি সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর উন্নয়নমূলক কর্মসূচি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে জোর এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠন শক্তিশালী করার উদ্যোগ তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে।

আজ, কয়েক দশক পরও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ঐতিহাসিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কারণ তিনি এমন এক নেতা, যিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে এসে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, অর্থনৈতিক বাস্তববাদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে একসঙ্গে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া একটি বিষয় স্পষ্ট করে—জিয়াউর রহমানকে বিশ্ব দেখেছিল একজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, যিনি একটি অস্থির রাষ্ট্রকে নতুন পথ দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যু তাই শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনারূপে বিবেচিত হয়েছিল।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun