না থেকেও প্রতিমুহূর্তে তিনি আছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে। কবে তিনি দেশে ফিরবেন, আবার কি খেলবেন বাংলাদেশের হয়ে? বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তাঁর খেলা মানেই বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের সেই টুর্নামেন্টের খোঁজখবর রাখতে শুরু করা। তবু দেশের ক্রিকেটে ব্রাত্য হয়ে আছেন সাকিব আল হাসান। কেমন কাটছে তাঁর এই সময়টা, সত্যিই কি ভাবেন আবার দেশের হয়ে খেলবেন, তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোরই-বা কী অবস্থা? যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুঠোফোনে তারেক মাহমুদকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সব বিষয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন সাকিব—
প্রশ্ন:
বিশ্বব্যাপী ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বদৌলতে ক্রিকেটারদের জীবন এখন অনেকটাই যাযাবরের মতো। জাতীয় দলে না খেললেও প্রায় দুই বছর ধরে আপনার ক্ষেত্রে কথাটা আরও বেশি প্রযোজ্য। কেমন লাগে এই জীবন?
সাকিব আল হাসান: (হাসি) এটা আমি কীভাবে আপনাকে বোঝাই…। জাতীয় দল তো জাতীয় দলই, এটার কোনো বিকল্প হয় না। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আগেও খেলতাম, এখনো মোটামুটি খেলার ভেতরে আছি। জাতীয় দলে খেলা হচ্ছে না, এই আরকি। পার্থক্য তো থাকেই। তবে জাতীয় দলেও কি কেউ সারা জীবন খেলে নাকি! এটা ঠিক, জাতীয় দলে অনুশীলন বা ফিটনেস ট্রেনিংয়ের যে সুযোগ-সুবিধা থাকে, সেটা কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে এলে এটা নিয়েই বেশি কষ্ট করতে হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় থাকলে আরও ঝামেলা। জাতীয় দলে তো সবকিছু রেডি থাকে। এখানে নিজে নিজে করে নিতে হয়।
প্রশ্ন:
যদি কখনো কোনো কোচের সহায়তা লাগে, সেটাও তো নেই সেখানে, নাকি?
সাকিব: কোচের সাহায্য তো ধরেন এই সময় অত গুরুত্বপূর্ণ না। হ্যাঁ, একটা গাইডেন্স থাকলে অবশ্যই ভালো। কারণ, কোচের চোখে দেখাটা তো অন্য রকম। তবে যেহেতু সবকিছু নিজেই জানি-বুঝি, মোটামুটি একটা ধারণা আছে। অত বেশি সমস্যা হয় না। সমস্যা হচ্ছে সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারটা। বিশেষ করে নিউইয়র্কে ওই ধরনের কোনো সুযোগ-সুবিধাই নেই।
প্রশ্ন:
তাহলে কীভাবে প্র্যাকটিস করেন?
সাকিব: কিছুই করি না, শুধু ফিটনেস করি। এ কারণেই কোনো জায়গায় ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট খেলতে হলে আগে চলে যাই। পাঁচ-সাত-দশ দিন আগে। এমনিতে যদি আমি তিন দিন আগে যেতাম, এখন সাত দিন আগে যাওয়া লাগে। যেখানে খেলা হয় সেখানে তো সুযোগ-সুবিধা থাকে। সেখানে গিয়ে কদিন অনুশীলন করি।
প্রশ্ন:
যুক্তরাষ্ট্রে বা যেসব জায়গায় খেলতে যান, লোকজন আপনার এখনকার জীবন নিয়ে কিছু বলে? সবাই তো জানে আপনার অবস্থাটা…
সাকিব: না, এইগুলো নিয়ে কেউ বেশি খুব একটা আলাপ করে না। সর্বোচ্চ হয়তো জানতে চায়, ভাই, কবে যাচ্ছেন দেশে? কোনো কিছু হলো নাকি… সবার মনে আসলে একই প্রশ্ন, আমার মনেও যে প্রশ্ন (হাসি)।
প্রশ্ন:
জাতীয় দলে না খেলায় অনেকটা সময়ই আপনার অবসরে কাটছে। পরিবারের সঙ্গে থাকছেন। ক্যারিয়ারজুড়ে ব্যস্ততার তুলনায় গত প্রায় দুই বছরের জীবনটা একটু অন্য রকম। নিজেকে নিয়ে ভাবা, পেছন ফিরে তাকানো—এসবের সময়ও নিশ্চয়ই পেয়েছেন। তো সেখানে কোনো ভুলভ্রান্তি কি চোখে পড়ে?
সাকিব: খুব বেশি একটা না। তবে আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের হিসাবে সময়ের আগে আমি অনেক কিছু করে ফেলছি। ধরুন, আমি হয়তো একটু আগেই এমন অনেক কিছু করে ফেলেছি, যেটা তখন দেশের মানুষ নিতে পারেনি। যেহেতু অনেক কিছুই আমি প্রথম করেছি, বেশির ভাগ জিনিস তো স্বাভাবিকভাবেই মানুষ বুঝে উঠতে পারেনি। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলা থেকে শুরু করে এনডোর্সমেন্ট—সব ক্ষেত্রেই। আমার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে গেলে সব সময়ই সমস্যা হয়েছে। এনডোর্সমেন্টের জন্য খেলার মাঝে ছুটি নেওয়া বা খেলার আগে-পরে; এইগুলা নিয়ে সমস্যা হতো। এখন দেখেন, এগুলো অনেক স্বাভাবিক হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তো এখন আপনারাই বলেন, কেন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে ছুটি দেওয়া হচ্ছে না, কেন অমুককে ছুটি দেওয়া হবে না, কেন অমুক দেশের সঙ্গে খেলার জন্য কাউকে আটকে রাখা হচ্ছে! কিন্তু আমার সময় আমি বারবার হয়ে যেতাম দেশদ্রোহী। কেউ আমাকে সাপোর্ট করেনি। তা-ও ঠিক আছে…আসলে কাউকে না কাউকে তো শুরু করতে হয়। আমার ক্ষেত্রে ও রকম হওয়াতেই হয়তো পরে অন্যদের জন্য ভালো হয়েছে।
প্রশ্ন:
জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা মিস করেন?
সাকিব: হ্যাঁ, সেটা তো যে কেউই মিস করবে। ধরুন, এই যে মুশফিক ভাই, বা আরও আগের হাবিবুল বাশার ভাইয়ের কথা যদি বলি, যাঁরা জাতীয় দলে খেলেছেন, দল থেকে বেরিয়ে প্রত্যেকেই সেটা মিস করেন, এটাই স্বাভাবিক। এটা একটা বিশেষ জায়গা।
প্রশ্ন:
আপনার ক্ষেত্রে তো ব্যাপারটা ভিন্ন। আপনি খেলার মতো অবস্থায় থেকেও মাঠের বাইরের কারণে খেলতে পারছেন না। আপনার তো আফসোস লাগার কথা…
সাকিব: সেটা তো অবশ্যই ভিন্ন। তবে আফসোস কখনো লাগেনি। টেলিভিশনে দলের খেলা দেখেও কখনো মনে হয় না যে আমি তো খেলছি না! কয়েকবার সাসপেন্ড-টাসপেন্ড হয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে মনে হয় (হাসি)। ওইটা মিস করি না। হ্যাঁ, খেলতে পারছি না, এটার কষ্ট তো আছেই।
প্রশ্ন:
আপনার দেশে ফেরার একটা প্রক্রিয়ার কথা শুনি। সেটা এখন কী অবস্থায় আছে?
সাকিব: কোনো অবস্থায় নেই। আমি আইনগতভাবে যা করা সম্ভব করছি। আশা করি, অন্তত একটা বিষয় খুব তাড়াতাড়ি সমাধান হয়ে যাবে। খুবই তাড়াতাড়ি। এরপর থাকবে দুইটা কেস।
প্রশ্ন:
আপনার বিরুদ্ধে মামলা তিনটি নাকি চারটি?
সাকিব: আমার ধারণামতে তো তিনটা। তিনটার ভেতরেই চারটা আরকি। মানে একটার ভেতরেই দুইটা মনে হয়… এ রকম কিছু।
প্রশ্ন:
কোনটার সমাধান দ্রুত হবে বললেন? বলা যাবে?
সাকিব: কোনো একটা হবে, আগে হোক। আগে থেকে না বলি।
প্রশ্ন:
বিষয়টা কি আপনার আইনজীবীরাই দেখছেন নাকি বিসিবি বা আর কেউ সংশ্লিষ্ট আছেন? মামলাগুলোর অবস্থাই-বা কী?
সাকিব: আমার আইনজীবীরাই দেখছেন। কিছু বিষয় আছে জামিন নেওয়া সম্ভব নয়। এটা তদন্ত করে তারা রিপোর্ট দেবে যে আমি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত আছি কি নেই। যদি না থাকি তাহলে ক্লিয়ার। আর যদি থাকি তাহলে কেস করলে তখন আমার জামিন নেওয়ার ব্যাপার—এ রকম কিছুই আমার ধারণা। আমি আসলে আইনের ভাষাটা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
প্রশ্ন:
আপনাকে তো কেউ দেশে ফিরতে নিষেধ করছে না। তবে এ ব্যাপারে আপনারও নিজস্ব একটা সিদ্ধান্ত থাকার কথা যে মামলাগুলো ঠিক এই পর্যায়ে এলে আপনি দেশে ফিরবেন। সেই পর্যায়টা কী?
সাকিব: আমিও বলছি না সেটা। দেশে তো আমি ফিরতে চাইলে এখনো ফিরতে পারব। আমি চাই মোটামুটি একটা নিরাপত্তা আর দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা ওঠানো, যেটা খুবই সম্ভব। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা না ওঠানো পর্যন্ত আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। এবং অবশ্যই নিরাপত্তা, এই দুইটা জিনিস আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন:
কী ধরনের নিরাপত্তা চান আপনি?
সাকিব: স্বাভাবিক একটা নিরাপত্তা তো লাগেই। মব হতে পারে, যেকোনো সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে, কত কিছুই তো হতে পারে। মানুষের কিছু রাগ থাকতেই পারে। বা কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকেও কিছু করতে পারে। আমি বুঝি, গ্যারান্টি দিলেও অনেক সময় অনেক কিছু ঘটে, সেটা অন্য জিনিস। তারপরও একটা আছে না যে কেউ আশ্বাস দিয়ে বলছে, বিপদ হলে দেখবে বা অন্তত আমার একটা বলার জায়গা থাকা। এটুকু অনুরোধ তো আমার থাকতেই পারে।
প্রশ্ন:
যেহেতু মামলা আছে, দেশে এলে কি আপনার গ্রেপ্তারের ভয় আছে?
সাকিব: বিষয়গুলো এখন যেখানে আছে, সেখানে গ্রেপ্তারের কোনো ভয় আছে বলে আমার মনে হয় না। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাটাই একমাত্র সমস্যা। তারপরও যদি জোর করে কেউ কিছু (গ্রেপ্তার) করতে চায়, সেখানে তো আসলে আমার কিছু করার নেই। ওটা নিয়ে চিন্তাও নেই আমার। গ্রেপ্তার হওয়াটা সমস্যা না।
প্রশ্ন:
শুনেছি কোনো একটি মহল থেকে নাকি টাকাপয়সার বিনিময়ে আপনাকে মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এটা কি ঠিক?
সাকিব: হ্যাঁ, এ রকম একটা প্রস্তাব আমার কাছে এসেছে যে এই টাকা দিলে মামলা ইয়ে করে দেবে…।
প্রশ্ন:
কত টাকা চেয়েছে? একটু বিস্তারিত বলবেন ঘটনাটা?
সাকিব: এই তো, বলেছে যে এক কোটি টাকা দিলে আমার নাম কেস থেকে উঠিয়ে দেবে। তবে যে বা যারা টাকাটা দাবি করছে, তাদের ধারণা নেই যে কেসটা যেহেতু করে ফেলেছে, এখন চাইলেও তারা নাম ওঠাতে পারবে না। বা তারা ওঠালেও পুলিশ যে ওঠাবে বিষয়টা তা না। আলটিমেটলি পুলিশের থেকেই এটার ক্লিয়ারেন্স আসতে হবে যে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
প্রশ্ন:
প্রস্তাবটা কারা দিল, বাদীপক্ষ?
সাকিব: হ্যাঁ, এফআইআরে বাদীপক্ষে যাঁর নাম আছে যোগাযোগ করার জন্য, তিনি দু-একজনের মাধ্যমে যোগাযোগটা করেছেন। কাদের মাধ্যমে, আমি তাঁদের নাম বলতে চাচ্ছি না।
প্রশ্ন:
প্রস্তাব পাওয়ার পর আপনি তাঁদের কী বলেছেন?
সাকিব: আচ্ছা, এসব টাকা দিয়ে কেন করতে হবে ভাই? টাকা দেওয়া মানে তো হচ্ছে আমার সমস্যা আছে, আমি চাচ্ছি যে আমাকে এখান থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হোক। হতে পারে তারা ভেবেছে আমার কাছে অনেক বেশি টাকা, চাইলেই হলো। আমিও এই আশাই করি, যেন অনেক বেশি টাকা থাকে আমার কোনো সময় (হাসি)।
প্রশ্ন:
বিসিবির অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি তামিম ইকবাল আপনার একসময়ের সতীর্থ। সভাপতি হওয়ার পর ক্যাপ্টেনস কার্ডের ব্যাপারে তিনি আপনাকে ফোন করেছেন শুনেছি। এরপর কি আর যোগাযোগ হয়েছে?
সাকিব: না, ওই সময়ই ফোন দিয়ে বলেছিল যে আমারও কার্ড আছে। ওইটা নেওয়ার জন্য। ক্যাপ্টেনস কার্ড, ক্রিকেটার্স কার্ড—দুইটা কার্ডই পাব ইনশা আল্লাহ।
প্রশ্ন:
কয়েক দিন আগে আপনার দেশে ফেরা ও মামলা-মোকদ্দমার প্রসঙ্গে আরও দুই সাবেক অধিনায়ক নাঈমুর রহমান ও মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রসঙ্গে টেনে তামিম ইকবাল বলেছেন, আপনারা সবাই একই অবস্থায় আছেন। শুধু আপনাকে নিয়ে কথা বলাটা তাঁর জন্য ঠিক হবে না। এ ব্যাপারে কী বলবেন?
সাকিব: (হাসি) আসলে আমি জানি না যে দুর্জয় ভাই (নাঈমুর) আর মাশরাফি ভাই আবার জাতীয় দলে খেলবেন, এ রকম চিন্তা করছেন কি না। সেটা হলে হয়তো আমরা তিনজন একই পর্যায়ে আছি। সেটা না হলে একই পর্যায়ে অবশ্যই আমরা নেই। তিনজন তিনটা পর্যায়ে আছি। আমি এটা অবশ্যই সমর্থন করি যে যারা ভুক্তভোগী সবার নামই আলোচনায় আসা উচিত। কিন্তু যদি বলেন যে খেলার প্রশ্ন, তাহলে তো আমার মনে হয় বাংলাদেশ দল হয়তো একজন অফ স্পিনার আর একজন পেস বোলার খুঁজছে। আর আমি লেফট আর্ম স্পিনার। সেটা যদি না হয়, তাহলে এটা সম্পূর্ণ ভুল একটা কথা আমার মনে হয়। আমার ফেরার সঙ্গে খেলা জড়িত, এটা না বোঝার কিছু নেই।
প্রশ্ন:
তামিম ইকবালের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল আপনার। তো তিনি বোর্ডের দায়িত্ব নেওয়াতে আপনার জন্য সুবিধা হলো নাকি অসুবিধা হলো?
সাকিব: এখানে সুবিধা-অসুবিধা হওয়ার কিছু আছে বলে মনে করি না। তবে নির্বাচনের পরে একটা বোর্ড এলে তাদের যদি কোনো চিন্তা থাকে তো থাকল কিংবা যদি চিন্তা না থাকে, সেটাও আমি জানব।
প্রশ্ন:
রাজনীতিতে তো ঢুকেছেন। তামিমের মতো ভবিষ্যতে ক্রিকেট প্রশাসনেও কি আসার ইচ্ছা আছে?
সাকিব: না। আমি মনে হয় আগেও বলছি যে আমার ও রকম ইচ্ছা নেই। খেলা ছাড়ার পর আমার স্পোর্টসের সঙ্গে থাকার কোনো ইচ্ছা নেই বললেই চলে। তবে কোচিং করানো বা মেন্টর ধরনের কিছু হলে হয়তো একটা সম্ভাবনা থাকবে। সেটা আমি উপভোগ করব। এ ছাড়া নয়।
প্রশ্ন:
কোচিং কোর্স করার ইচ্ছা আছে নাকি ভবিষ্যতে?
সাকিব: না, কোর্স করার কোনো ইচ্ছা নেই, কোর্স করে কোচ হব না।
প্রশ্ন:
বাংলাদেশের সর্বকালের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা আপনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে আপনার অবদান আপনার শত্রুও স্বীকার করবে। কিন্তু আপনার মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সাত মাসের রাজনীতিটাই বড় হয়ে গেল এবং এর জন্য আপনি ভুগছেন। এটা কতটা অপ্রত্যাশিত?
সাকিব: শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, আমার কাছে অগ্রহণযোগ্যও। কিন্তু এটা নিয়ে আর কীই-বা বলব! আপনি তো তা-ও বলছেন যে সাত মাস। অনেকে তো বলে যে একটা ফেসবুক পোস্ট না দেওয়াতেই নাকি…। মানে কী একটা অবস্থা!
প্রশ্ন:
এই দেড়-দুই বছরে কখনো কি মনে হয়েছে আপনার আরও ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করে রাজনীতিতে আসা উচিত ছিল?
সাকিব: না, আমার মনে হয় ঠিক ছিল, ঠিক আছে, ঠিকই থাকবে। আজকে যেটা ঠিক মনে হয় না; ১ বছর, ৫ বছর, ১০ বছর পরে মনে হয় যে সেটাই ঠিক ছিল। মানুষ বারবার ভুলে যায় যে আমি একটা নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলাম। আর ক্রিকেট যখন খেলেছি, সারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছি। এলাকার মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছেন দেখেই আমি জিতেছি। তাঁরা যদি ভোট না দিতেন, আমি জিততাম না। সারা দেশের মানুষ তো আমাকে ভোট দেননি। তাঁরা এই পার্থক্যটা করতে পারেন না।
প্রশ্ন:
আপনার রাজনীতিতে আসার স্বপ্ন যে খুব অল্প সময়ে ধাক্কা খেল, সেটার জন্য হতাশা নেই?
সাকিব: আমার তো মনে হয় এতে আমার পরিপক্বতা আরও বাড়বে।
প্রশ্ন:
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আপনার এখন কী ধারণা? আগে তো দূর থেকে দেখেছিলেন রাজনীতিটাকে…
সাকিব: আমার মনে হয়, আরও অনেক বেশি কিছু করার আছে এখানে, যেটা আমি চিন্তা করতাম, তার থেকেও বেশি কিছু। আগে ভাবতাম সিদ্ধান্ত নিলেই হয়তো সিস্টেমের অনেক কিছু বদলে ফেলা সম্ভব। এখন মনে হয় আরও বেশি কিছু করার দরকার আছে। রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলানোরও দরকার আছে। আমাদের দেশের অনেক মানুষ মনে করে, রাজনীতি খারাপ জিনিস। কিন্তু রাজনীতি ছাড়া তো কোনো কিছু বদলানো সম্ভব নয়। আমি বুঝি না যে রাজনীতিটা কীভাবে খারাপ জিনিস হলো? এখানে তো মানুষের সেবা করার সুযোগ আছে।
প্রশ্ন:
মানুষ তো আসলে ঠেকে শিখেছে। তারা হয়তো মনে করে রাজনীতি তাদের ভালো কিছু দিতে পারেনি…
সাকিব: এটা তো আমাদের সমস্যা। কারণ, আমরা যাঁদের নির্বাচিত করি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা সেবা করার চেয়ে সেবা নিতে পছন্দ করেন বেশি। নিজেদের লাভের জন্য রাজনীতিতে আসেন। যাঁরা সেবা করতে আসতে চান, তাঁদের আমরা আবার ঢুকতে দিই না। যে কেউ রাজনীতিতে আসতে পারেন, যে কেউ যেকোনো দল করতে পারেন। এটাতে রাইট-রংয়ের কোনো বিষয় নেই। যে খারাপ কাজ করবেন কিংবা করছেন তাকে শাস্তি দিতে হবে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এটাও নিশ্চিত করা উচিত কেউ যেন বিনা কারণে না ভোগে। দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনি-আমি সবাই তো সেটাই চাই যে ভালো মানুষ ভালো থাকবে, খারাপ মানুষের শাস্তি হবে। আবার তাদের ভালো হওয়ার সুযোগও দিতে হবে।
প্রশ্ন:
আপনার দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কি আপনার এখনো নিয়মিত যোগাযোগ আছে?
সাকিব: হ্যাঁ, তারাই যোগাযোগ করে, আছে। একটা যোগাযোগ তো থাকেই।
প্রশ্ন:
রাজনীতির প্রতি ও আপনার রাজনৈতিক দলের প্রতি আপনি দায়বদ্ধ থাকছেন। কিন্তু দেশে ফিরতে চাচ্ছেন একজন ক্রিকেটার হিসেবে। আপনার দলের অন্য নেতা-কর্মীদের তো সে সুযোগ নেই। তাঁরা আপনার এই ফেরাটাকে কীভাবে দেখবেন?
সাকিব: সেটা তো আসলে আমার পক্ষে বলা মুশকিল। ওনারাই ভালো জানবেন।
প্রশ্ন:
আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার মতো অবস্থায় আসলে কতটা আছেন? ফিটনেস, ফর্ম—সব মিলিয়ে…
সাকিব: বেশ কিছুদিন একটা গ্যাপ গেছে। তবে কিছুদিন ট্রেনিং করলে আশা করি আবার পুরো সঠিক অবস্থায় আসা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন:
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর কত দিন খেলতে চান? বা যদি অন্যভাবে বলি, খেলার জন্য দেশে ফেরার অপেক্ষা কত দিন করবেন?
সাকিব: এ রকম কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করিনি ভাই, এটা বলা মুশকিল।
প্রশ্ন:
প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব নেওয়ার পর হাবিবুল বাশার বলেছেন, সাকিব যদি ফেরেন, তাহলে তিনি তাঁকে এক-দুটি সিরিজের জন্য চাইবেন না। তিনি চাইবেন সাকিবকে যেন ২০২৭ বিশ্বকাপের বিবেচনায়ও রাখা যায়। এটা নিয়ে কী বলবেন?
সাকিব: সেটা যদি তিনি চিন্তা করেন, আমিও খুশি হব। আমিও তখন সেভাবে চিন্তা করতে পারব। অবশ্যই টি-টোয়েন্টি আর টেস্ট সেভাবে আর মাথায় নেই আমার। হয়তো একটা করে সিরিজ খেলব সুযোগ পেলে। তবে অন্য যেকোনো ফরম্যাটের তুলনায় ওয়ানডেতে মনে হয় আমার অনেক বেশি অবদান রাখার সুযোগ আছে। আর যেহেতু বিশ্বকাপটাও আছে…।
প্রশ্ন:
আপনি তাহলে আত্মবিশ্বাসী, সুযোগ পেলে বিশ্বকাপের জন্য ফর্ম-ফিটনেস থাকবে?
সাকিব: অবশ্যই। ওই চেষ্টা তো করতেই হবে। তবে আত্মবিশ্বাসী আমি থাকতেই পারি, তার মানে এই নয় যে আমি ভালো করবই। এ রকম কোনো গ্যারান্টি নেই। তবে এটা তো খেলার ওপর নির্ভর করবে, মানে একটা-দুইটা সিরিজ খেললে বোঝা যাবে। তখন আমিও সিদ্ধান্ত নিতে পারব, তারাও আমার সম্পর্কে বুঝতে পারবে।
প্রশ্ন:
সম্প্রতি আপনি বলেছেন সর্বশেষ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলাটা অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আপনার দৃষ্টিতে বিশ্বকাপ না খেলে বাংলাদেশ কোন জায়গাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো?
সাকিব: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে খেলোয়াড়েরা। ক্রিকেট দলীয় খেলা হলেও একজন একজন করে খেলোয়াড় নিয়েই একটা দল হয়। তাদের জায়গা থেকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে পারতেন আমাদের ক্রিকেটাররা। এই দলগুলো এখন হয়তো বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বিবেচনা করারও সাহস পাবে না। বিশ্বকাপ একটা বড় জায়গা। প্রতি দুই বছরে একটা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ হয়, দুই বছর পরপর খেলোয়াড়েরা নিজেকে দেখার সুযোগ পায় যে আসলে তারা কোথায় আছে। এখন সে গ্যাপটা আমাদের জন্য চার বছরে চলে গেল। কাজেই দুই বছর তো আপনি এমনিতেই পিছিয়ে গেলেন। আপনি সিরিজ জিতবেন, সিরিজ হারবেন। কিন্তু এভাবে আপনি বুঝতে পারবেন না যে আসলে কতটুকু হচ্ছে না হচ্ছে। কারণ, আসল পরীক্ষার মুখোমুখি আমরা সব সময় হই যখন আমরা বিশ্বকাপের মতো কোনো টুর্নামেন্ট খেলি। আমরা সেই পরীক্ষার সুযোগটা হারালাম।