অধিকাংশ সময়েই স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো হৃদস্পন্দনের প্রতিও আমরা আলাদা করে নজর দিই না। ফলে শরীরে বড় কোনো রোগ বাসা বাঁধলেও তা শনাক্ত করতে এবং চিকিৎসা শুরু করতে বেশ দেরি হয়ে যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, হৃৎস্পন্দনের এই ছন্দপতন মোটেও স্বাভাবিক নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যারিদমিয়া’। অনেকেই হয়তো এই রোগটির নামের সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু নিজে যে এতে আক্রান্ত হয়েছেন তা বুঝতেই পারেন না। অনিয়মিত এই পাল্স রেট বা নাড়ির গতি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ভারতের জেনারেল মেডিসিন চিকিৎসক চন্দ্রমৌলী মুখোপাধ্যায়।
কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া কী?
চিকিৎসকদের মতে, কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে হৃদ্যন্ত্র খুব দ্রুত, খুব ধীরে বা অনিয়মিতভাবে স্পন্দিত হতে থাকে। সব অ্যারিদমিয়াই যে বিপজ্জনক—এমন নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো বড় ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। মূলত হৃদ্যন্ত্রের সংকোচন-প্রসারণ ঠিকমতো না হলে সারা শরীরে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছাতে পারে না। আর সেখান থেকেই শুরু হয় মূল জটিলতা।
নাড়ির গতি ও অ্যারিদমিয়ার প্রকারভেদ
সাধারণত নাড়ির গতি বা পাল্স রেটের ওপর ভিত্তি করে অ্যারিদমিয়াকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—
ট্যাকিকার্ডিয়া : বিশ্রামরত অবস্থায় হৃদস্পন্দনের হার যদি প্রতি মিনিটে ১০০ বারের বেশি হয়।
ব্র্যাডিকার্ডিয়া : বিশ্রামের সময়ে হৃদস্পন্দনের হার যদি প্রতি মিনিটে ৬০ বারের কম হয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ : পাল্স কম বা বেশি হলেই কেউ রোগে আক্রান্ত—এমনটা ভাবার কারণ নেই। যেমন, কেউ দৌড়ে কোথাও গেলে সাময়িকভাবে তার পাল্স ১০০ পার হতে পারে। আবার অ্যাথলিট বা খেলোয়াড়দের বিশ্রামরত অবস্থায় পাল্স স্বাভাবিকভাবেই ৬০-এর কম থাকে। তাই পাল্সের ওঠানামার সঙ্গে অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখা জরুরি।
রোগ শনাক্ত করবেন যে লক্ষণ দেখে
বুক ধড়ফড় করা : এটি অ্যারিদমিয়ার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। বুক ধড়ফড় করার পাশাপাশি মনে হতে পারে বুকের ভেতর হৃদ্যন্ত্রটি কাঁপছে বা খুব দ্রুত চলছে। কখনো আবার মনে হতে পারে হৃদস্পন্দনের মাঝে একটি ‘ড্রপ’ বা ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানো : হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হলে মস্তিষ্কে ও শরীরের অন্যান্য অংশে ঠিকমতো রক্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে মাথা ঘোরা, শরীরের ভারসাম্য হারানো বা হুট করে জ্ঞান হারানোর মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
শ্বাসকষ্ট : অল্প হাঁটলে বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হাঁপিয়ে যাওয়া হার্টের সমস্যার অন্যতম বড় ইঙ্গিত। হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হলে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে বাধা পায়, যার ফলে শ্বাসকষ্ট হয়।
ক্রমাগত ক্লান্তি : রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও যদি সারা দিন শরীর ক্লান্ত লাগে বা শক্তি পাওয়া না যায়, তবে তা অ্যারিদমিয়ার লক্ষণ হতে পারে। হার্ট ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে না পারলে তার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, ফলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায়।
বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি : সব বুকে ব্যথাই হার্ট অ্যাটাক নয়। তবে বুকের মধ্যে চাপ ধরা ভাব, অস্বস্তি বা ব্যথা হলে তা এড়িয়ে যাওয়া ভুল হবে। বিশেষ করে ব্যথার সঙ্গে যদি ঘাম, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট থাকে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি
চিকিৎসক চন্দ্রমৌলী মুখোপাধ্যায়ের মতে, ঘরে বসে কেবল অক্সিমিটারে বা হাত দিয়ে নাড়ি টিপে পাল্স রেটের সংখ্যা জানা সম্ভব। কিন্তু হৃৎস্পন্দনের ছন্দে কমছে কি না, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। রোগটি সঠিকভাবে শনাক্ত করার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফ, হল্টার মনিটরিং এবং থাইরয়েডের রক্তপরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।