1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভূক্ত’ করলো জাতিসংঘ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা তৃণমূল নেতা দীপঙ্কর গ্রেপ্তার, পাটখেত থেকে ২ কোটি টাকা উদ্ধার ঈদের রাতে ফরিদপুরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মশাল মিছিল ঈদের দিনেই বিষাদ: কোরবানির মাংস গলায় আটকে কিশোরের মৃত্যু বনলতা এক্সপ্রেস: মহাজাগতিক ভ্রমণ ও রূপান্তরের গল্প ১১ সেকেন্ডের ইতিহাস গড়া গোলটি দেশবাসীকে উৎসর্গ করলেন আনিকা জুলাই শহীদ পরিবারের সঙ্গে জামায়াত নেতাদের ঈদ উদযাপন ২৮ দিনের প্রস্তুতি আর বিমানবন্দরে ভোগান্তি, তবু লড়াকু মেয়েদের কুর্নিশ মালদ্বীপ কোচের আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দল এখনো চূড়ান্ত করতে পারেননি স্কালোনি

বনলতা এক্সপ্রেস: মহাজাগতিক ভ্রমণ ও রূপান্তরের গল্প

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ‘হুমায়ূন আহমেদ’–এর ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘তানিম নূর’ কর্তৃক পরিচালিত ও প্রযোজিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি হাস্যরসাত্মক ভ্রমণনির্ভর একটি ফ্যামিলি ড্রামা, যা আমাদের মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, গভীর জীবনবোধ ও মনস্তত্ত্বকে ভীষণভাবে আন্দোলিত করে। একটি ট্রেনযাত্রাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া এই সিনেমাটিতে ট্রেনের যাত্রীদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, হাসিঠাট্টা, কষ্ট, সহানুভূতি ও সম্পর্কের নানান রসায়ন ফুটে উঠেছে। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অপরিচিত একদল মানুষের জীবনের অব্যক্ত অনুভূতি, ব্যক্তিগত সংকট ও মানবিক মূল্যবোধের সংঘাতগুলো দৃশ্যমান হয়। এ সিনেমাটি কেবল একটি স্থানিক যাত্রা নয়, বরং এটি প্রতিটি চরিত্রের নিজের ভেতরের এক আত্মিক অন্তর্যাত্রা। এ সিনেমায় ব্যক্তিগত আবেগ, অব্যক্ত কষ্ট, হিউমার, যাতনা, সংবেদনশীলতা ও রাজনৈতিক সংকট এমনভাবে তুলে আনা হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে যাত্রীদের জীবনদর্শনকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিয়েছে।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর দুর্দান্ত মেকিং বা নির্মাণশৈলী, যা ট্রেনের একটি সীমাবদ্ধ পরিসরকে অসাধারণভাবে বড় পর্দায় জীবন্ত ও শৈল্পিক করে তুলেছে। সিনেমাটোগ্রাফার এ সিনেমায় ট্রেনের সংকীর্ণ করিডরে প্রতিটি চরিত্রের আলাদা পরত ফুটিয়ে তুলতে মিড-ক্লোজ রেঞ্জ ও সূক্ষ্ম মনিটর অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করেছেন। প্রত্যেক যাত্রীর গল্পে একধরনের ব্যক্তিগত ছোঁয়ার আবেশ দিতে তিনি ওভার-দ্য-শোল্ডার ও রিভার্স-অ্যাঙ্গেল শটের চমৎকার প্রয়োগ দেখিয়েছেন। এ সিনেমায় জানালার বাইরের কুয়াশা আর ট্রেনের ভেতরের অনুজ্জ্বল আলোর দৃষ্টিনন্দন ও রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে। এখানে গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন বগির পরিবেশ অনুযায়ী লাইটিং, রং ও আলো ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তা ছাড়া সিনেমার চিত্রনাট্য ও সম্পাদনায় ‘ম্যাচ-কাট’ কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে এক কামরার সংলাপের শেষাংশ অন্য কামরার শুরুতে যুক্ত (যেমন দরজার আওয়াজ বা চায়ের কাপের আওয়াজ) করা হয়েছে, যা বাংলা সিনেমায় আগে খুব একটা দেখা যায়নি। একাধিক চরিত্রের সংমিশ্রণ থাকলেও অনেক গল্প ও দৃশ্যের মধ্যে কোনো ছন্দপতন দেখা তো যায়ইনি; বরং সিনেমার কাহিনি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়েছে। তা ছাড়া দৃশ্যের ট্রানজিশনগুলো এতই মসৃণ ও সাবলীল ছিল যে এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে চলে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছে, যা দর্শকদের মস্তিষ্কে একধরনের সম্মোহনী আচ্ছন্নতা তৈরি করেছে।

এবার সিনেমার অসাধারণ চরিত্রগুলো বিশ্লেষণে আসা যাক। এ সিনেমার প্রতিটি চরিত্র একেকটি ভিন্ন আদর্শ, সামাজিক স্তর ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের প্রতিনিধিত্ব করে। পুত্রশোকে কাতর প্রফেসর রশীদ উদ্দিন একজন স্থিতধী ও গভীর জীবনবোধসম্পন্ন দার্শনিক ব্যক্তিত্ব, যার প্রতিটি সংলাপ, শরীরী ভাষা, রসবোধ দর্শকদের জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। মন্ত্রী আবুল খায়ের খান চরিত্রটি ক্ষমতার দম্ভ, পতন, রাজনৈতিক জটিলতা এবং মানবিকতার দ্বন্দ্বের প্রতীক। সিনেমার শুরুতে অত্যন্ত কঠোর ও দাপুটে হলেও গল্পের শেষে তাঁর মানবিকতা দারুণভাবে উন্মোচিত হয়েছে। মন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে সুরমা আভিজাত্য ও একাকিত্বের মাধ্যমে তাঁর নীরবতা অনেক না–বলা কথা বলে দেয়। বিশেষ করে সংকটের সময় তাঁর মানবিক রূপটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চিত্রা একজন প্রাণবন্ত তরুণীর চরিত্র, যার মাধ্যমে ট্রেনের তাবৎ পরিবেশ দর্শকেরা পর্যবেক্ষণ করেন। বর্তমান প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী ডাক্তার আশহাব চৌধুরী মেধাবী ও অস্থির প্রকৃতির চরিত্রটি ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের মধ্য নিজের অস্তিত্বকে খোঁজার চেষ্টা করে। সহযাত্রী চিত্রা ও প্রফেসর রশীদ উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন ও দার্শনিক তর্কালাপ চরিত্রটিকে আরও গভীরতা দিয়েছে। তা ছাড়া চিত্রা ও আশহাবের মধ্যকার কথোপকথনগুলো তরুণ প্রজন্মের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারাকে উপস্থাপন করে। থার্ড পারসন পয়েন্ট অব ভিউয়ের মাধ্যমে মৃত তরুণের আত্মার ধারা বর্ণনা সিনেমার ন্যারেটিভকে প্রভাবিত করে এবং প্যাসিভ অবসার্ভার বা পরোক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে জীবন ও জগতের রহস্যময়তা বিষয়ে তার ভাবনাগুলো আমাদের গভীরভাবে সংবেদনশীল করে তোলে।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর পোস্টার থেকে

‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর পোস্টার থেকেকোলাজ

এ ছাড়া গল্পের প্রাণ প্রফেসর রশীদ উদ্দিন চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করা মোশাররফ করিমের রসবোধ, অপরাধবোধ, সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি ও গভীর শোক সিনেমাটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিঃসন্তান শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে চঞ্চল চৌধুরীর আক্ষেপ ও রাজনৈতিক গাম্ভীর্যের দ্বন্দ্বটি ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। তা ছাড়া সাবিলা নূর, শরীফুল রাজ, আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, ইন্তেখাব দিনার, শামীমা নাজনীনের মতো শিল্পীরা বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়ের মাধ্যমে অত্যন্ত সফলভাবে চরিত্রের গভীরতা প্রকাশ করেছেন। এসব গুণী অভিনয়শিল্পীর এক্সপ্রেশন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও নীরবতা এতই শক্তিশালী ছিল যে অনেক দৃশ্য সংলাপ ছাড়াই দর্শকদের আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।

গল্পকার হুমায়ূন আহমেদ ও পরিচালক তানিম নূর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় বেশ কিছু শক্তিশালী এবং গভীর প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করেছেন, যা সিনেমাটিকে একটি ভৌগোলিক ভ্রমণ থেকে আত্মানুসন্ধানে রূপান্তর করেছে। এ সিনেমায় মানবসত্তার দীর্ঘ যাত্রা ও জীবনের চলমানতার প্রতীক হিসেবে ট্রেন; মধ্য ও উচ্চবিত্তসহ গোটা সমাজের রূপক হিসেবে ট্রেনের কামরা বা কম্পার্টমেন্ট; মনের ভেতরে চেপে রাখা অব্যক্ত যন্ত্রণার সুর ও হৃৎস্পন্দন হিসেবে ট্রেনের চাকার শব্দ এবং অজানা ভয়, একাকিত্ব ও রহস্যের রূপক হিসেবে শীতের রাত ও কুয়াশাকে দৃশ্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া যমুনা ও ফয়সালের উদ্দাম নাচের দৃশ্য রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির সংবেদনহীনতা ও রুচিহীনতা একটি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গাত্মক রূপক। তা ছাড়া ‘জন্মের পর আজান দেওয়া হয় কিন্তু নামাজ নেই, আর মৃত্যুর পর নামাজ হয় কিন্তু কোনো আজান নেই’—এই একটি সংলাপই সিনেমার মূল দর্শনকে একটি বাক্যে বেঁধে ফেলেছে এবং এর মাধ্যমে জীবনের নশ্বরতা, ক্ষুদ্রতা, অনিবার্যতা ও সময়ের প্রবহমানতাকে মানবজীবনের একটি সত্যিকার দার্শনিক তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ ছাড়া সিনেমার তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপ, ‘যাত্রাটা ট্রেনের নয়, যাত্রাটা জীবনের’ আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যমে মহাজাগতিক ভ্রমণকেই নির্দেশ করে।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার ফার্স্টলুকে মোশাররফ করিম ও শরীফুল রাজ

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার ফার্স্টলুকে মোশাররফ করিম ও শরীফুল রাজছবি: ভিডিও থেকে

এদিকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সাহিত্যনির্ভর সিনেমাটি হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসের মূল নির্যাস বজায় রেখে আধুনিক নির্মাণশৈলীতে সাফল্যের সঙ্গে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখার চিরচেনা বৈশিষ্ট্য, সহজ সংলাপ, সূক্ষ্ম রসবোধ ও মানবিক সম্পর্কের গভীরতা এ সিনেমায় নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। পরিচালক পরিকল্পিতভাবে মূল উপন্যাসের সংলাপ ও চিত্রনাট্য হুবহু অনুকরণ না করে একটি স্বাধীন শিল্পকর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তা ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের কল্পিত অলৌকিক চরিত্রের মতো ‘মৃত তরুণের আত্মা’র সর্বব্যাপী উপস্থিতির মাধ্যমে পরিচালক জাদুবাস্তবতা ও মেটা-টেক্সচুয়াল আমেজ ব্যবহার সিনেমাকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

অপর দিকে, সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র হিসেবে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি হুমায়ূন আহমেদের মূল উপন্যাসের বিষয়বস্তুকে অক্ষুণ্ণ রেখে সিনেমার ক্লাইমেক্সে নাটকীয়তার প্রয়োজনে দৃশ্যের কিছুটা অতিরঞ্জন করা হয়েছে। সাহিত্যের মেজাজ রক্ষা করে গভীর অর্থবহ সংলাপ ও সূক্ষ্ম রসবোধ সিনেমাটিতে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। চিত্রনাট্যকার উপন্যাসের মূল দর্শন বজায় রেখেও বড় পর্দার উপযোগী করে কাহিনিতে নাটকীয়তা ও গতিশীলতা এনেছেন, যা দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এবং খুশবন্ত সিংয়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘পামেলা রুকস’ পরিচালিত কালজয়ী ছবি ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’—উভয় সিনেমাই রেলভ্রমণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও এদের বিষয়বস্তু ও মেজাজে বেশ পার্থক্য রয়েছে। ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ ১৯৪৭ সালের দেশভাগের বিভীষিকা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও নিষ্ঠুরতার এক ঐতিহাসিক দলিল। বিপরীতে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ একটি জীবনধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত সংকট ও মানবিক মূল্যবোধের জয়গানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ অনেকটা ধ্রুপদি ও সরলরৈখিক স্টোরিটেলিং ঘরানার চলচ্চিত্র এবং ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ অত্যন্ত আধুনিক মেকিং ও ‘ম্যাচ-কাট’ এডিটিংয়ের মাধ্যমে সাহিত্যকে এক ভিন্ন ভিজ্যুয়াল ভাষা দিয়েছে। এ ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ কর্তৃক পরিচালিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমাটি ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম ও মানুষের আদিম প্রবৃত্তিনির্ভর গল্প। আর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের মানসিক সংকট, ক্ষমতা, দম্ভের পতন ও মানবিক রূপান্তরের গল্প।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এ সাবিলা নূর। অভিনেত্রীর ফেসবুক থেকে

‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এ সাবিলা নূর। অভিনেত্রীর ফেসবুক থেকে

অন্যান্য বোটল মুভি বা আবদ্ধ সিনেমা থেকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ ও কারিগরি দিক থেকে কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের। সাধারণত আবদ্ধ মুভি হিসেবে এই সিনেমার সিংহভাগ দৃশ্যই ট্রেনের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ। একটি সীমিত ও বদ্ধ পরিসরে কীভাবে একটি সিনেমার গল্প গতিশীল হয়েছে—এ সিনেমা একটি অনন্য উদাহরণ। এদিকে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’—উভয় সিনেমার প্রায় অধিকাংশ দৃশ্যই আবদ্ধ স্থানে (নৌকা ও ট্রেন) সীমাবদ্ধ। ‘হাওয়া’ সিনেমাটি ফ্যান্টাসি, প্রেম, রহস্য ও প্রতিশোধের একটি গল্প, যেখানে অলৌকিকতা ও মিথের প্রাধান্য রয়েছে। অন্যদিকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ একটি জীবনধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা, যা মানবিক রূপান্তরের সচিত্র চিত্রায়ণ।

এ ছাড়া অন্যান্য রোড ড্রামা বা ট্রাভেল মুভি গল্পের মূল ভাব বিবেচনায় ট্রেনের বাহ্যিক গতির চেয়েও মানুষের ভাবনার গতি এবং অন্তর্যাত্রা এ সিনেমার মূল বিশেষত্ব। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক যাত্রা নয়, বরং মানুষের জীবনবোধ ও আত্মোপলব্ধির এক সূক্ষ্ম অন্তর্মুখী অভিযাত্রা। তারেক মাসুদের ‘অন্তর্যাত্রা’ এবং তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’—উভয় সিনেমাই বাহ্যিক একটি যাত্রার আড়ালে মানুষের আত্মিক বা মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের গল্পনির্ভর এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে যাত্রাপথে চরিত্রের ভেতরের পরিবর্তন বা আত্মোপলব্ধি এ দুটি সিনেমায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে হারানো দেশ ও বাবাকে খুঁজে পাওয়ার এক শান্ত ভ্রমণকে উপজীব্য করে নির্মিত তারেক মাসুদের সিনেমাটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও কিছুটা ‘ডকুমেন্টারি’ ঘরানার। আর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আধুনিক কারিগরি উৎকর্ষে ভরপুর এবং এতে ম্যাচ-কাট টেকনিক ও জাদুবাস্তবতার ব্যবহার রয়েছে।

 ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার নানা লুকে শরীফুল রাজ

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার নানা লুকে শরীফুল রাজকোলাজ

স্বল্প বাজেটের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার গানগুলো কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং গল্পের গভীরতা বাড়াতে এবং দর্শকদের আবেগ-অনুভূতি মন্থন করতে এক জাদুকরি ভূমিকা পালন করেছে। নতুন আঙ্গিকে অর্থহীন ব্যান্ডের ‘চাইতেই পারো’ গানটি সিনেমার নস্টালজিক আবহকে আরও গভীর ও অনুভূতিশীল করেছে। কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর ‘উড়াল দেব আকাশে’ গানটি মূলত মুক্তি ও আধ্যাত্মিকতা বোঝাতে গল্পের মূল ভাবের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়েছে। সহজ কথায়, এ গানের বিশৃঙ্খল নাচের দৃশ্য অভিজাত শ্রেণির মেকি ও কুরুচির বহিঃপ্রকাশ। অর্ণবের গাওয়া ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ রবীন্দ্রসংগীতটি সিনেমার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে (ট্রেনে শিশু জন্মানোর সময়) ব্যবহৃত হয়েছে।  তা ছাড়া আহব সংগীত হিসেবে ভায়োলিন, কি-বোর্ড ও গিটারের কোমল–শান্তা আবেগঘন সুর ট্রেনের কামরার ভেতরকার চরিত্রগুলোর নিঃসঙ্গতা ও নীরব যন্ত্রণাকে প্রতিনিধিত্ব করে। পাশাপাশি এ সিনেমায় ট্রেনের চাকার শব্দ একধরনের রিদম তৈরি করেছে, যা মানবমনের গতির সমান্তরালে বয়ে চলে।
বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার শিল্পগুণ নিয়ে লিখতে গেলে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে চলে আসে, যা সমকালীন গতানুগতিক কমার্শিয়াল সিনেমা থেকে এ চলচ্চিত্রটিকে আলাদা করেছে।  গল্প বলার মুনশিয়ানা, রং ও আলোর ব্যবহার, শব্দ প্রকৌশল, ক্ষমতাসীন ও সাধারণের সহজাত পার্থক্য, হুমায়ূনীয় বিষণ্ণতা ও হিউমার, অভিনয়ের গভীরতা, জীবনমুখী দর্শন ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য সিনেমাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তা ছাড়া উন্নত শিল্পনির্দেশনা বা নান্দনিকতা প্রোডাকশন ডিজাইন এই চলচ্চিত্রটিকে একটি ইউনিক ‘ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং’ বা দৃশ্যকাব্যে পরিণত করেছে। সিনেমায় ব্যবহৃত কালার প্যালেট শীতের রাতের কুয়াশা ও মানুষের একাকিত্বকে প্রকাশের মাধ্যমে এ সিনেমাটিকে একটি সাধারণ কমার্শিয়াল ড্রামা থেকে সরিয়ে আর্ট ফিল্মের মর্যাদা দিয়েছে।

সাহিত্যনির্ভর সিনেমার নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত লেখকের দেওয়া মূল নামই প্রাধান্য পায়। ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু অক্ষুণ্ণ রেখে বর্তমান বাস্তবতা, জীবনের গতিশীলতা, ট্রেনকে চরিত্রে রূপান্তর, সমকালীন দর্শকদের চাহিদা, বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করলে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামটি যথার্থ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সাহিত্য থেকে সেলুলয়েডে রূপান্তরের ক্ষেত্রে, মূল উপন্যাসের নাম পরিবর্তন করে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ রাখা কেবল যৌক্তিকই নয়, বরং এটি সিনেমার দৃশ্যপট ও আবেগপ্রবণ আবহের আহব পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাস্তবিক অর্থে, উপন্যাসের মূল দর্শন সামনে রেখে সিনেমার এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে পরিচালক তানিম নূর যে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, সেটা বাংলাদেশের সিনেমা ইতিহাসে একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করেছে।

এদিকে অসাধারণ সবকিছুর পরেও এ সিনেমার বেশ কিছু দুর্বল দিক রয়েছে, যা পরিচালকের ক্ষেত্রে অতিক্রম করার অনেক সুযোগ ছিল। সিনেমার প্রথমার্ধে কাহিনির গভীরে প্রবেশ করতে পরিচালক অনেকটা সময় নিয়ে ফেলেছেন, যা সাধারণ দর্শকদের কাছে কিছুটা একঘেয়ে লাগতে পারে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত দিক থেকে ট্রেনের বাইরের দৃশ্যগুলোতে ব্যবহৃত ভিএফএক্স বা গ্রিন স্ক্রিনের কাজ আরও নিখুঁত হতে পারত। ট্রেনের ভেতরের লাইটিং ও জানালার বাইরের প্রাকৃতিক আলোর মধ্যে অনেক সময় অমিল দেখা গেছে। রাতের দৃশ্যগুলোতে অত্যধিক কৃত্রিম আলোর ব্যবহার এতটাই বেশি ছিল যে ট্রেনের স্বাভাবিক পরিবেশকে কৃত্রিম স্টুডিওর সেট বলে বেশি মনে হচ্ছিল। সম্পাদনার ক্ষেত্রে আরও কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করলে সিনেমার গতি আরও যথার্থ হতে পারত বলেই মনে হয়।
সিনেমার মানবিক সংবেদনশীলতা, জীবনমুখী দর্শন ও পরিচিত নস্টালজিয়ার কারণে দর্শকেরা বেশ আবেগপ্রবণ হয়েছেন। পরিচালক তানিম নূর হুমায়ূন আহমেদের গল্পকে যে শৈল্পিক দক্ষতা দিয়ে তুলে এনেছেন, তা সাধারণ দর্শকদের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে। সিনেমাটিতে এমন কিছু আবেগময় দৃশ্য ছিল, যা দর্শকদের হৃদয়ে সরাসরি স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে ‘একজন পিতার তার মৃত সন্তানের স্মৃতি বয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য’, ‘মরণাপন্ন একজন নারীকে বাঁচানোর জন্য সময়ের সঙ্গে এক অসম লড়াই’ এবং ‘ক্ষমতা ছেড়ে একজন মন্ত্রীর সাধারণ মানুষে পরিণত হওয়ার মুহূর্ত’। আর এই খণ্ড খণ্ড জীবনচিত্রগুলো দর্শকদের নিজেদের জীবনের কোনো না কোনো দুঃখের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া ট্রেনযাত্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টায় তৈরি হওয়া গভীর সখ্য নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি বলে চিত্রিত হয়েছে। পাশাপাশি সিনেমাটির সমাপ্তি দৃশ্য ‘টুইস্ট’ হিসেবে দর্শকদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক, মর্মস্পর্শী ও চমকপ্রদ ছিল, যা দর্শকদের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
এদিকে তানিম নূর বাংলাদেশের সমকালীন চলচ্চিত্রে এমন একজন নির্মাতা, যিনি গ্ল্যামার বা সস্তা বিনোদনের চেয়ে মানবিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে দৃশ্যায়ন করতে বেশি আগ্রহী। সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কাজ করা বরাবরই চ্যালেঞ্জিং। কারণ, পাঠকের মনে একটা পূর্বপরিকল্পিত চিত্র থাকে। তানিম নূর এখানে হুমায়ূন আহমেদের গল্পের সেই জাদুকরি বাস্তবতা বজায় রেখেও নিজস্ব সিগনেচার স্টাইল যুক্ত করেছেন। ট্রেনের একটি সীমিত পরিসরে এতগুলো শক্তিশালী চরিত্রের পারফরম্যান্সকে সুসংহতভাবে পরিচালনা করা ছিল তাঁর বড় কৃতিত্ব। তিনি সংলাপের চেয়ে দৃশ্য ও রঙের ব্যবহারকে সিনেমায় চিত্রায়ণ করতে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর প্রতিটি সিনেমায় পরিবেশ নিজেই একটি চরিত্রে রূপ নেয়, যা দর্শককে কাহিনির ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। এদিকে তানিম নূরের ক্যারিয়ারের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নির্মাণকৌশলে পরিপক্বতা এসেছে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ‘স্টোরিটেলার’ থেকে একজন সার্থক ‘ভিজ্যুয়াল পোয়েট’ বা দৃশ্যকাব্য রচয়িতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘ফিরে এসো বেহুলা’ এবং ‘উৎসব’–এর মতো সফল ও ব্যতিক্রমী সিনেমার নির্মাণে অভিজ্ঞতার আলোকে পরিচালক তানিম নূর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমায় অভূতপূর্ব  নৈপুণ্য ও পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন। তা ছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘কাইজার’ ও ‘কন্ট্রাক্ট’-এর মতো সিরিজগুলো অভিজ্ঞতা তাঁর কারিগরি দক্ষতাকে অনেক তীক্ষ্ণ করেছে। বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ পরিচালক সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনে দ্রুতগতির দৃশ্যান্তর, চটকদার সংলাপ, আইটেম সং, মারদাঙ্গা দৃশ্য চিত্রায়ণে মনোযোগী হলেও তানিম নূর সাহসের সঙ্গে  নীরবতা ও ধীরলয় চিত্রায়ণকে বেছে নিয়েছেন। তা ছাড়া ধীরস্থির কিন্তু চিন্তাশীল নির্মাণশৈলীই তানিম নূরকে সমসাময়িক অন্য সব নির্মাতা থেকে আলাদা করেছে।
পরিশেষে কেবল বিনোদন নয়, বরং জীবনবোধ, নৈতিকতা ও উন্নত মানবিকতা শেখাতে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি বিশেষ বার্তা বহন করে। ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব, বিপদে মানবিক ঐক্য, শোক বা স্মৃতিকে পেছনে ফেলে জীবনকে সহজভাবে নেওয়া, অচেনা মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনের শিক্ষা আমরা এ সিনেমাটি থেকে পেতে পারি। এ সিনেমা স্থানিক গন্তব্যের তুচ্ছতা ও আত্মিক পরিশুদ্ধতার মাধ্যমে অনিবার্য এক মহাজাগতিক ভ্রমণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি আত্মপরিশুদ্ধি ও জীবনের গভীর দর্শন খুঁজে পেতে এবং মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা করার বিষয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।
—শেখ হাফিজুর রহমান সজল, উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun