1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ন

হারিয়ে যাওয়া মানুষটি ৩৮বছর পর দরজায় কড়া নাড়লেন

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

একটি বাড়ি। একটি অপেক্ষা। একটি দীর্ঘশ্বাসে ভরা জীবন।

৩৮ বছর আগে যে মানুষটি অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন, তাকে ঘিরে একসময় সব আশাই শেষ হয়ে গিয়েছিল। 

স্বজনরা ভেবেছিলেন, হয়তো তিনি আর পৃথিবীতেই নেই। কিন্তু সময়ের নির্মম হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে গতকাল সোমবার বিকেলে সেই মানুষটিই ফিরে এলেন নিজের জন্মভিটায়। আর তাতেই আনন্দ, কান্না আর বিস্ময়ে ভেসে গেল মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দি গ্রামে।

ফিরে আসা মানুষটির নাম জবেদ আলী (৬৬)। তিনি ওই গ্রামের মৃত তোফাজ্জল ম-লের ছেলে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সোমবার বিকেলে গ্রামের পথে একটি বৃদ্ধ মানুষকে ধীরে ধীরে হাঁটতে দেখা যায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, মুখে সময়ের গভীর ছাপ। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি, তিনি বহন করে আনছেন ৩৮ বছরের বিচ্ছেদের ইতিহাস।

বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় ক্লান্ত স্ত্রী রুশিয়া খাতুন প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর যেন চিনতে 
পারেন সেই চেনা মুখ। তারপর বুকফাটা আর্তনাদÑ‘ওই তো আমার মানুষ!’

চিৎকার শুনে ছুটে আসেন পরিবারের সদস্যরা। মুহূর্তেই কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির আঙিনা। কেউ তার হাত ধরে কাঁদছেন, কেউ বুকে জড়িয়ে ধরে হারানো সময়কে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে পারিবারিক অভিমান থেকে চার বছরের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও স্ত্রী রুশিয়া খাতুনকে রেখে হঠাৎ বাড়ি ছাড়েন জবেদ আলী। এরপর বছরের পর বছর খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কখনো শোনা গেছে তিনি নাকি দেশের এক প্রান্তে আছেন। কখনো গুজব উঠেছে তিনি মারা গেছেন। প্রতিটি খবরের পেছনে ছুটেছেন স্বজনরা। কিন্তু সবশেষে ফিরে এসেছে শুধু হতাশা।

অপেক্ষা করতে করতে একসময় বৃদ্ধ হয়ে যান মা। ছেলের ফেরার আশায় পথ চেয়ে থাকতে থাকতেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। একই পরিণতি হয় দাদিরও। কিন্তু তাদের সেই প্রতীক্ষার অবসান আর দেখা হয়নি।

জবেদ আলীর স্ত্রী রুশিয়া খাতুন বলেন, ‘প্রথম কয়েক বছর প্রতিদিন মনে হতো, আজ হয়তো ফিরে আসবে। তারপর মাস গেছে, বছর গেছে। মানুষ বলতে শুরু করল, সে আর বেঁচে নেই। কিন্তু আমার মন কখনো তা মানতে 
পারেনি। আজ যখন সামনে দেখলাম, মনে হলো আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে তখন চার বছরের শিশু ছিল। এখন সে বিদেশে থাকে। বাবার ফেরার খবর শুনে সে কান্না করেছে। দেশে ফিরে বাবাকে জড়িয়ে ধরবে বলে জানিয়েছে।’

গ্রামের প্রবীণরা জানান, জবেদ আলী শুধু একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন গ্রামের পরিচিত মুখ। লাঠিখেলায় তার ছিল দারুণ সুনাম। যাত্রাপালার মঞ্চে তার অভিনয় দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত।

চাচাতো ভাই বক্কার আলী বলেন,  ‘জবেদ ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের গ্রামের ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিল। নতুন প্রজন্ম শুধু গল্প শুনেছে। আজ সেই গল্পের মানুষটিকে সামনে দেখে সবাই বিস্মিত।’

এদিকে নিজের জীবনের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি জবেদ আলী।

চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘অভিমান ছিল। সেই অভিমানেই চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু যত দূরেই গেছি, পরিবারের কথা ভুলতে পারিনি। রাতে কাজ শেষে একা বসে স্ত্রী-সন্তানের কথা ভাবতাম। অনেক সময় কান্না চলে আসত। তবু ফিরে আসার সাহস পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকের কাজ করেছি। জীবন চলেছে, কিন্তু মন চলেনি। মানুষের ভিড়ে থেকেও আমি একা ছিলাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, সংসারের ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। তাই শেষ বয়সে সব অভিমান মুছে ফিরে এলাম নিজের মানুষের কাছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun