জেলার মধুপুর উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদিত জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আনারসের স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয়। কিন্তু কিছু অসাধু লোভী কৃষক অধিক লাভের আশায় রাসায়নিকের অত্যাধিক ব্যবহারে আনারসের সুনাম নষ্ট করছে। এরই প্রেক্ষিতে মধুপুরের আনারসের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে স্বল্প খরচ ও ভাল দাম পাওয়ায় কৃষকরা এখন অর্গানিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত নিরাপদ আনারস চাষে ঝুঁকছেন।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আনারসের রাজধানী হিসেবে খ্যাত মধুপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশব্যাপী এই সুমিষ্ট আনারসের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু আনারস চাষীরা বেশি লাভের আশায় আনারসের আকার, রং উজ্জল ও অসময়ে বাজারে উঠাতে নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে ভালো দাম পাওয়ার আশায় রমজান মাস’কে টার্গেট করে ছোট বড় গাছে একসঙ্গে ফুল ও ফলন আসার জন্য রাসায়িক মিশ্রণ স্প্রে করে, যা সিজার হিসেবে পরিচিতি।
এ সময় নিয়মিত হরমোন এবং পাকানোর জন্য নিয়ন্ত্রিত হরমোন প্রয়োগের ১০-১২ দিন পরেই আনারস হারভেস্টের উপযোগী হয়। আনারস দেখতে হলুদ বর্ণ হলেও সেটা বিষাক্ত ফলে পরিণত হয়। স্বাদ ও ঘ্রাণ ঠিক থাকে না। এ কারণেই অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে আকারে বড় এবং আকর্ষণীয় রঙ তৈরি হলেও নষ্ট হচ্ছে আনারসের স্বাদ-গন্ধ ও গুণাগুণ।
তবে ইদানিংকালে মানুষ সচেতন হওয়ার কারণে এবং বিষযুক্ত আনারস না কেনায় মধুপুরে বিষমুক্ত আনারসও চাষ হচ্ছে। আনারসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সোহেল রানাসহ অনেক কৃষক এখন নিরাপদ আনারস চাষ করছেন।
সরেজমিনে জেলার মধুপুর উপজেলার ফুলবাগ চালা ইউনিয়নের হাগুড়া কুড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সোহেল রানা আনারস বিক্রির উদ্দেশ্যে তার ক্ষেত থেকে আনারস সংগ্রহ করছেন।
এ সময় এ প্রকল্পের উদ্যোক্তা সোহেল রানার সাথে কথা হয়। তিনি বাসস’কে বলেন, ২০২৫ সালে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর আর্থিক সহায়তায় ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসএসএস’ এর সহযোগিতায় এ কাজে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এ সংস্থা থেকেই অনুদান পাওয়া ৬০হাজার টাকা এবং তার নিজস্ব অর্থায়নে নিরাপদ আনারস প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। মোট চার বিঘা (১২০ শতাংশ) জমিতে নিরাপদ আনারসের আবাদ করেন।
তিনি জানান, ওই জমিতে হানিকুইন জাতের ২৪ হাজার আনারসে চারা রোপণ করেন। সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে জৈব সার প্রয়োগ করে নিরাপদ আনারস চাষ করেন। চারা রোপণ থেকে শুরু করে আনারস হারভেস্ট করা পর্যন্ত আঠারো মাসে পর্যায়ক্রমে মোট ৫০ জন শ্রমিক তার এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। তাদের বেতন ও অন্যান্য সকল খরচ বাবদ তার ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে সোহেল রানা মোট ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকার আনারস বিক্রি করেছেন। আরো প্রায় ৭০ হাজার টাকা আনারস বিক্রি করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে যেখানে অতিরিক্ত রাসায়নিক কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো প্রতি পিস বড় সাইজের আনারস ২৫-৩০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হয়। সেখানে অর্গানিক পদ্ধতিতে নিরাপদ আনারস বিক্রি করছেন ৪০-৪৫ টাকা দরে।
নিরাপদ আনারস চাষি সোহেল রানা বাসস’কে জানান, মধুপুরের আনারসের স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়। বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করতে গিয়ে বেশি লাভের আশায় অনেক চাষিরা আনারসের আকার, রং উজ্জল ও অসময়ে বাজারে উঠানোর জন্য নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এতে সুনাম হারাতে বসেছে মধুপুরের আনারসের। তার মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক কৃষক আনারসের স্বাদ, গন্ধ ও তার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে নিরাপদ আনারস চাষ করছি। চাষাবাদে খরচ কম ও দাম ভালো পাওয়ায় দিন দিন আমার মত আরও অনেক চাষি বিষমুক্ত ও নিরাপদ আনারস চাষে ঝুঁকছেন।
তিনি আরো জানান, তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থানীয় এলাকার মিজানুর রহমান সবুজ, রনি মিয়া, কল্যাণ ম্যাথিউ নিরাপদ আনারস চাষ শুরু করেছেন। এছাড়াও মধুপুর গড় অঞ্চলে প্রায় শতাধিক চাষি এখন নিরাপদ আনারস চাষে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
নিরাপদ আনারসের বাজারজাত সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল রানা জানান, পুরাতন চাষি হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানের ক্রেতারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনেন। উত্তরবঙ্গের নীলফামারী, রংপুর, বগুড়া সিরাজগঞ্জ এবং ঢাকা থেকে ক্রেতারা তার ক্ষেত থেকে সরেজমিনে এসে আনারস কিনে নিয়ে থাকেন।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নিজের ফেসবুক পেজ এস আর ব্লগ বিডি এর মাধ্যমে অনলাইন এ নিরাপদ আনারস অর্ডার নিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতাদের কাছে নিরাপদ আনারস পৌঁছে দিচ্ছেন সোহেল রানা।
কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ও অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা আনারস চেনার উপায় সম্পর্কে জুয়েল রানা জানান, প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ক আনারসের গোড়ার দিকে হলুদ রং হবে এবং উপরের দিকটা সবুজ থাকবে। আনারস কাটলে সুঘ্রাণ বের হবে এবং খেতে সুমিষ্ট হবে। অন্যদিকে হরমোন দিয়ে পাকানো আনারস সম্পূর্ণ হলুদ বর্ণের হবে। দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সুঘ্রাণ বের হবে না। খেতে সুমিষ্ট হবে না।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসএসএস এর নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ চন্দ্র পাল বাসস’কে বলেন, সংস্থাটি শুরু থেকেই জেলার মধুপুর গড় ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন নতুন কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে আনারস চাষিদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে সাসটেইনেবল মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ এন্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (স্মার্ট) প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজর ৮শ’ সদস্যদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের উপকার ভোগীরা নিরাপদ আনারস চাষ করে আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. আশেক পারভেজ বাসস’কে বলেন, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চলে ছায়ান্টকিউ, হ্যানি কুইন ও ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত এমডি-২ যাতের আনারস আবাদ হচ্ছে। অধিক মুনাফার আশায় আনারস চাষীরা মাত্রাতিরিক্ত হরমোন প্রয়োগ করে থাকে। ওই আনারস খেলে মানব দেহে দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ হতে পারে। এমনকি লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়াসহ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। তাই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি মধুপুরের আনারসের সুঘ্রাণ ও অতুলনীয় স্বাদ এবং আনারসের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কেমিক্যালমুক্ত আনারস চাষে চাষীদের সবসময়ই উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে আনারসের ব্যাপক চাহিদা। বিশ্বজুড়ে আনারস ফল হিসেবে ও আনারসজাত পণ্য রফতানিতে প্রথম সারিতে রয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন। সুতরাং, নিরাপদ আনারস চাষের মাধ্যমে আমাদের দেশে আনারস থেকে ভ্যালু এডিশনের মাধ্যমে খাদ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু বেভারেজ কোম্পানি আনারসের জুস বিদেশে রফতানি করছে এবং এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সরকারের কাছে নানা প্রকল্প প্রস্তাব আকারে পাঠিয়েছি।