অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার গঠনের শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল। তবে গত ছয় মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত পদক্ষেপগুলো নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফেরাতে কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে খুনের ঘটনা বেড়েছে। একই সাথে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের হারও ঊর্ধ্বমুখী।
সম্প্রতি রংপুরের মেছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড জনমনে নতুন করে ভীতি ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনার কারণ নিয়ে পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে। রংপুরের এই আলোচিত ঘটনার তদন্তে পুলিশের পেশাদারত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমেই কেবল এই সংশয় দূর করা সম্ভব। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজন মাদকাসক্ত। এর আগে গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিও মাদকাসক্ত ছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুনের ঘটনা ঘটেছে ১৮টি, যেখানে মোট ৪৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ১৪টি ঘটনা ঘটেছে নিজ বাড়িতে, যা মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এসব খুনের পেছনে মাদক, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কিংবা পারিবারিক কলহের মতো কারণগুলো সামনে আসছে। বিশেষ করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মাদকের উৎসমুখ বন্ধ না করে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত না করে কেবল মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলা অর্থহীন। ঘর বা আবাসস্থলে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সমাজজুড়ে যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করছে, তা প্রশমিত করার দায়িত্ব সরকারের। কেবল কাগজে-কলমে অগ্রাধিকারের কথা বললেই হবে না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতিতে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ, যেখানে ঘরে-বাইরে সবখানেই নাগরিকেরা নিরাপদ বোধ করবেন। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও যৌক্তিক তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রংপুরের এই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব ঘটনায় শিশুরাও খুনিদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব খুন গোটা সমাজেই নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি দ্য আইরিশ টাইমস বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির মহামারি নিয়ে এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল ‘এই জিনিসটা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ রকম একটা সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভাষ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পুলিশ কতটা পেশাদারত্ব বজায় রাখতে পেরেছে, সেটাও বড় একটা প্রশ্ন।