কক্সবাজারের উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের ভাষা বুঝতে শেখা মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতেমা আক্তার এখন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অপেক্ষায়। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় শুরু হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসে অংশ নেবেন তাঁরা। গত বছর ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে ১৮টি দেশের মধ্যে নবম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ, যা এই দুই অ্যাথলেটের জন্য এশিয়ান গেমসের দরজা খুলে দেয়। এবারের আসরে ১৭টি দেশের মোট ৪৮ জন অ্যাথলেট সার্ফিংয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
মান্নানের সার্ফিংয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে। বর্তমানে তিনি কক্সবাজারের সুগন্ধা বিচে পর্যটকদের কাছে শামুকের গয়না ও কসমেটিকস বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ভ্যান থেকে দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করে পরিবার চালানোর পাশাপাশি তিনি সার্ফিং চালিয়ে যাচ্ছেন। মান্নানের মতে, সার্ফিং এখন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, একটি সার্ফিং বোর্ডের দাম ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, যা তাঁর মতো একজন সাধারণ মানুষের জন্য কেনা অত্যন্ত কঠিন। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের সার্ফারদের তুলনায় তাঁদের সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। ইউটিউবের ভিডিও দেখে এবং মালদ্বীপে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সমুদ্রের কৌশলগুলো আয়ত্ত করেছেন।
অন্যদিকে, ১৬ বছর বয়সী ফাতেমা আক্তারের গল্পটা লড়াইয়ের এক অনন্য উদাহরণ। শৈশবে বাবাকে হারানোর পর অভাবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। কক্সবাজারের মহেশখালীর বাসিন্দা ফাতেমা দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। মেয়েদের জন্য সমাজের তৈরি নানা অদৃশ্য বাধা ও সংসারের চাপের মুখে অনেকেই সার্ফিং ছেড়ে দিলেও ফাতেমা নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। সার্ফিং ছেড়ে দেওয়া অনেক সহকর্মী তাঁকে বিয়ের বদলে খেলাটি ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ফাতেমা জানান, তিনি কেবল নিজের মনের কথা শুনেছেন এবং পড়াশোনার পাশাপাশি অনুশীলনে মনোযোগ ধরে রেখেছেন।
সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে মান্নান ও ফাতেমার লড়াইটা অনেকটা জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ঢেউ আসে, বোর্ড ছুটে চলে, আবার ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়—কিন্তু তাঁরা বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা এবং অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে তাঁরা এখন জাপানের সমুদ্র জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। তাঁদের এই যাত্রা বাংলাদেশের সার্ফিং ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। পদক জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে সময় কথা বলবে, তবে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি তাঁদের চূড়ান্ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দূর থেকে ঢেউ দেখতে কার না ভালো লাগে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোন ঢেউ আপনাকে সামনে এগিয়ে দেবে, আর কোনটি মুহূর্তেই ছিটকে ফেলবে—তা বুঝতে হয় অভিজ্ঞতায়; বারবার পড়ে গিয়ে, আবার উঠে দাঁড়িয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কক্সবাজারের ঢেউ তাঁদের শুধু সার্ফিংয়ের কৌশল শেখায়নি, শিখিয়েছে প্রতিকূলতার মুখে স্থির থাকতে, ব্যর্থতার পর আবার ফিরে আসতে এবং যত বাধাই আসুক, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যাঁদের জীবনে ঢেউ কখনো এসেছে অভাবের রূপে, কখনো পরিবারের আপত্তি হয়ে, কখনো সামাজিক বাধা কিংবা অনিশ্চয়তা হয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পড়ে গেছেন, আঘাত পেয়েছেন, আবার বোর্ড হাতে সমুদ্রে ফিরেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত বছর ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে ১৮ দেশের মধ্যে নবম হয় বাংলাদেশ; যার সুবাদে প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এই দুজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মান্নানের গল্পের শুরু কক্সবাজার সৈকতেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুগন্ধা বিচে একটি ভ্যানই তাঁর জীবিকার অবলম্বন।