ইতালির প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৮০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারপ্রধানের রেকর্ড গড়েছেন জর্জিয়া মেলোনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটিতে গঠিত সরকারগুলোর মধ্যে তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি সরকার টানা ১,৪১৩ দিন ক্ষমতায় রয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি ধনকুবের ও মিডিয়া ব্যবসায়ী সিলভিও বারলুসকোনির একক মেয়াদের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। তবে বিভিন্ন মেয়াদে মিলিয়ে প্রায় নয় বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সামগ্রিক রেকর্ডটি এখনো বারলুসকোনির দখলেই রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, যুদ্ধের পর প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত আট দশকে ইতালিতে ৬৮টি সরকার গঠিত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি সরকার গড়ে মাত্র ১৩ মাস ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছে। মেলোনির এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান উদযাপনের জন্য তার দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ (এফডিআই) শুক্রবার দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বারিতে এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেছে। এই অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০টি কোচে করে সমর্থকদের নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। সন্ধ্যায় মেলোনির ভাষণের পাশাপাশি উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি ও আন্তোনিও তাজানিও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে এটি মেলোনির প্রচারণার একটি বড় সুযোগ।
সরকার নিজেদের সাফল্যের ফিরিস্তি দিয়ে দাবি করছে, গত চার বছরে দেশে কর্মসংস্থান ১০ লাখ বেড়েছে এবং বেকারত্বের হার ৬ শতাংশের নিচে নেমেছে। এছাড়া ব্যক্তিগত আয়কর ২১০০ কোটি ইউরো বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার কমানো এবং অভিবাসীদের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করাকে তারা বড় অর্জন হিসেবে দেখছে। বিশ্বমঞ্চে ইতালির প্রভাব বৃদ্ধির দাবিও করেছেন মেলোনি। জাতীয়তাবাদী অবস্থানের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইতালি কারও কাছে অনুনয় করে না’, যা ইতালীয়দের মধ্যে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।
তবে মেলোনির এই পরিসংখ্যানের বিপরীতে সমালোচকেরা দেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর দিকে আঙুল তুলছেন। সিজিআইএল (CGIL) ট্রেড ইউনিয়নের প্রধান মাউরিজিও লান্দিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মজুরি বাড়েনি, উল্টো পেট্রলের দাম বৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান কমে যাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এছাড়া বিরোধীরা মেলোনি সরকারের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ ও অস্ত্রের অর্থনীতি’ এবং ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ তৈরির অভিযোগ এনেছে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে মেলোনির বিরুদ্ধে অন্য ধরনের সমালোচনাও রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে তিনি অতিরিক্ত মধ্যপন্থি হয়ে উঠেছেন। ২০২৭ সালের নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চি আরও কট্টর ডানপন্থি অবস্থান নিয়ে মাঠে নেমেছেন। জনমত জরিপে ভান্নাচ্চির দল মেলোনির জোটের দুই শরিক—লিগ ও ফোরজা ইতালিয়ার চেয়েও এগিয়ে রয়েছে, যা মেলোনির জন্য আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মেলোনির শুরুতে অস্বাভাবিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে ট্রাম্প দাবি করেন, মেলোনি তার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মেলোনি এবং তার নেতৃত্বাধীন সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকারকে সমালোচকেরা অবশ্য বলছেন, পরিসংখ্যান তুলে ধরলেও দেশের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের তালিকায় রয়েছে দুর্বল উৎপাদনশীলতা, জনসংখ্যাগত সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সরকারি প্রশাসনে দীর্ঘদিনের অদক্ষতা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়াও বড় ধরনের সমালোচনার বিষয়। চাকরির আরও তথ্য: পেট্রলের দাম বেড়েছে, চাকরির অনিশ্চয়তা বেড়েছে, মানুষ কম অবসরে যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আগের চেয়ে কম কার্যকরভাবে চলছে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অভিবাসন ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে ভান্নাচ্চি কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।