হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইতালিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে চুক্তির শর্ত শিথিলের মেয়াদ বাড়িয়েছে কাতার এনার্জি। এর ফলে কাতারনির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্লুমবার্গ ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের ক্রেতাদের চলতি সপ্তাহে কাতার এনার্জি জানিয়েছে, এলএনজি চালান বাতিলের এই পরিস্থিতি অক্টোবর মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। একই ধরনের নোটিশ বাংলাদেশের ক্রেতাদেরও দেওয়া হয়েছে, যেখানে সেপ্টেম্বরের পরবর্তী সময় পর্যন্ত এই সীমাবদ্ধতা কার্যকর থাকবে। এছাড়া ইউরোপের বেশ কয়েকজন আমদানিকারককেও একই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ইতালির জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এডিসন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তাদের অ্যাড্রিয়াটিক এলএনজি টার্মিনালে নির্ধারিত আরও পাঁচটি চালান সরবরাহ করতে পারবে না কাতার এনার্জি। ফলে দেশটিতে সরবরাহ বন্ধের মেয়াদ নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এডিসনের হিসাবমতে, কাতার এনার্জির সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়া জাহাজের সংখ্যা বেড়ে ২৯টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে গ্রাহকদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি রপ্তানিকারক কাতারের বিপুল পরিমাণ গ্যাস হরমুজ প্রণালি হয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত ৪ মার্চ প্রথমবার হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে কাতার এনার্জি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছিল। চুক্তির এই বিধানটি সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে কার্যকর হয়, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ঘটনায় চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
জ্বালানি সরবরাহ সংকটের পেছনে কেবল নৌপথের সমস্যাই নয়, বরং কাতারের নিজস্ব অবকাঠামোয় হামলার ঘটনাও দায়ী। মার্চ মাসে রাস লাফান শিল্প এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোর একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাতার এনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং দেশটির জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছিলেন, ওই হামলার কারণে কাতারের মোট এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় জুলাই মাসে, যখন কাতার এনার্জির এলএনজি বহনকারী জাহাজ ‘আল রেকাইয়াত’ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় হামলার শিকার হয়। কাতার এই ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। হামলায় জাহাজটির বাম পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কাতার এনার্জির সর্বশেষ এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে যে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ক্ষতির প্রভাব এখনো কাটেনি। শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউরোপসহ এশিয়ার দেশগুলোতে গ্যাসের চাহিদা বাড়লে এই সরবরাহ সংকট আরও প্রকট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।