জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির কাছে ক্ষমা না চাইলেও, পরোক্ষভাবে একাত্তরের ভূমিকার অবস্থান মেনে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল।
আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার জীবদ্দশায় দলটিকে ১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আসাদুজ্জামানের মতে, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শন ও স্টেটমেন্টের খসড়া তৈরি করেছিলেন, তা গ্রহণ করলে জামায়াতের অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জামায়াতের কর্মকাণ্ড অনেকটা সেই খসড়ার পথেই এগোচ্ছে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২২-এর সংশোধনী এবং ২০২৬ সালের পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞায় তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আল-বদর এবং জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের মতো দলগুলোর নাম বিরোধী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই আইন পাস করার সময় জামায়াতের কোনো সদস্য ‘না’ ভোট দেননি। তিনি বলেন, ‘না’ ভোট না দেওয়া এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই দলটি পরোক্ষভাবে একাত্তরের সেই ভূমিকার দায় মেনে নিয়েছে। পার্লামেন্টে কেবল নামের পূর্বে ‘তৎকালীন’ শব্দটি যুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছিল, যা ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই বলে আসাদুজ্জামান মন্তব্য করেন।
বইটিতে উপস্থাপিত রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা নিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ইসলামিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চিন্তা একটি ভ্রান্ত নীতি। তার মতে, সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের চর্চা ও রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমেই প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইটি কেবল গবেষণাধর্মী নয়, বরং তার জীবনদর্শনের একটি জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। অনুষ্ঠানে জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্বের অনুপস্থিতিকে তাদের সংকীর্ণতা ও ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভিন্নমতকে সহ্য করার মানসিকতা ছাড়া সমাজ সামনে এগোতে পারে না। বিএনপি সম্পর্কে বইটিতে থাকা সমালোচনাকে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবেই গ্রহণ করার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, সমাজকে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। বইয়ের আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আলী রীয়াজ, রাইট টু ফ্রিডম-এর প্রেসিডেন্ট জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ। তারা নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের রাজনৈতিক চিন্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আসাদুজ্জামান বলেন, ইসলামিক শাসন কায়েম করে চাপিয়ে দেবো, সেটা একটা ভ্রান্ত নীতি, ফ্যালাসি; বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্র গঠিত হোক, রাষ্ট্র পরিচালিত হোক— সেটাই হবে প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের সঠিক পথ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে ঠিক এইভাবে বিষয়টা এসেছে, আমি দেখলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমি রাজ্জাক সাহেবের ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের চিন্তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু একটা মূল্যবোধের জায়গা থেকে, একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গা থেকে আমার ধারণা, দিস ইজ দ্য প্রোস ফর জুরিস্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই বইটা আমার কাছে সাহিত্য মনে হয়নি, গবেষণাধর্মীও মনে হয়নি, এটা একটা জীবন্ত একজন মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজ্জাক সাহেব একটা সমাজকে তার জীবন দিয়ে যেভাবে দেখেছেন, তার জীবন দর্শন যেভাবে ছিল— এই বইটা তার একটা রিফ্লেকশন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আজকে জামায়াতের যারা মেইনস্ট্রিমের আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট বা আমাদের এই অঙ্গনে পরিচিত, জামাতের যারা লিডারশিপে আছেন— আমার প্রত্যাশা ছিল আজকের আলোচনায় তারা থাকবেন।