মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম করছে বলে মন্তব্য করেছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি সতর্ক করে বলেন, গাল্ফ অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি পুরো বিশ্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, বহু বছর ধরে সাময়িক সমাধান এবং অবাস্তব নীতির মাধ্যমে সংকট ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার কারণেই আজ এই পুঞ্জীভূত বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর প্রভাব কেবল আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আমিরের ভাষ্যমতে, কোনো একটি পক্ষ যখন প্রতিবেশী দেশগুলোকে তাদের নিজেদের যুদ্ধ নয় এমন সংঘাতের ভেতর টেনে আনে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনাগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রাণরেখায় আঘাত হানছে, যা সাধারণ মানুষের খাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে কাতার বরাবরই সংলাপের ওপর জোর দিয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধান সম্ভব। আঞ্চলিক ‘যৌথ নিরাপত্তা’ কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একে অপরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করবে এবং কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না।
গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখানে যা ঘটছে তা কেবল স্থানীয় সংকট নয়, বরং মানবজাতির বিবেকের জন্য একটি কলঙ্ক। ভবিষ্যতের প্রজন্ম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। দখলদার ইসরায়েলের সমালোচনা করে আমির বলেন, তারা অপরাধ করেও নিজেদের পক্ষেই সাফাই গায় এবং উল্টো বিভিন্ন মহলকে অভিযুক্ত করে দায় এড়াতে চায়। গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার, অবরোধ তুলে নেওয়া এবং নিঃশর্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কঠোর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রসঙ্গে শেখ তামিম বলেন, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ফিলিস্তিনিদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার, যা থেকে তাদের বঞ্চিত করা মানে একটি খোলা ক্ষত জিইয়ে রাখা। তিনি পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য ও আল-আকসা মসজিদের অবমাননার তীব্র প্রতিবাদ জানান। এছাড়া সিরিয়া ও লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আমির বলেন, ইসরায়েল প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং সেখানে দখলদারিত্ব বাড়াচ্ছে।
সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের সেনা উপস্থিতি ও দখলদারিত্বের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গোলান মালভূমি এবং লেবাননের ভূখণ্ডে তাদের কার্যক্রম ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। একইসঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণের বাইরের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্রীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
ভাষণের সমাপ্তি টেনে তিনি জানান, সিরিয়া ও লিবিয়ার পুনর্গঠনে কাতার সব সময় পাশে থাকবে। এছাড়া সুদানে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের ডাক দেন এবং সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। শেখ তামিম দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, কাতার কেবল মুখে মূল্যবোধের কথা বলে না, বরং ন্যায্যতার প্রশ্নে সবসময় আপসহীন। সবশেষে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে আলোচনার টেবিলে ফেরার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানোর সর্বশেষ সুযোগটি কাজে লাগানোর জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, গাল্ফ অঞ্চলের এই পরিস্থিতি ‘কারো কাছেই বিস্ময়ের হওয়া উচিত নয়’, বরং এর প্রভাব পুরো বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি মূলত ইরান যুদ্ধের কথাই ইঙ্গিত করেন, যার জেরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোয় হামলা চালানো হয়েছে এবং বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি জানান, বিরোধ নিরসনের একমাত্র পথ হিসেবে কাতার বরাবরই সংলাপ ও আলোচনাকে সমর্থন করে এসেছে-আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ন্যায্য সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর ভাষায়, ‘সংকট-পরবর্তী সময়েও এই অবস্থানই আমাদের রয়ে গেছে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর কথায়, ‘এমন ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতেই যুদ্ধ বেধে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি আরও বলেন, ‘একটি পক্ষের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেছে তার প্রতিবেশীদের এমন এক যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়া, যা আদতে তাদের নিজেদের যুদ্ধই নয়-উত্তেজনা এড়াতে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনকি বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি বাণিজ্য যে আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়, তা বন্ধ করে দেওয়াও সম্ভব হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণরেখাগুলোকে চাপ ও দর-কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত করাও সম্ভব হয়েছে, যার মাশুল দিচ্ছে প্রতিটি মহাদেশের মানুষ-যদিও এই সংঘাতের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই।’।