জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা উৎসব ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলা’। ৭৮তম এই আসরটি আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এবারের আয়োজনে বিশ্বের ১৩০টি দেশ থেকে প্রায় চার হাজার প্রকাশনা সংস্থা অংশ নিয়েছে। তবে মেলার এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল বেশ উত্তেজনাময়। দর্শকদের একাংশের প্রতিবাদ ও কটূক্তির মুখে মেলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। গতকাল মঙ্গলবার ডায়ালগ স্টেজে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাঁকে ঘিরে আগে থেকেই ব্যাপক আগ্রহ ও বিতর্ক ছিল। তাঁর প্রথম কথাতেই উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন এবারের সম্মানিত অতিথি দেশ চেক প্রজাতন্ত্রের সংস্কৃতিমন্ত্রী ওতো ক্লেমপির। তিনি দেশটির উগ্র ডানপন্থী ‘মোটরিস্টে’ দলের সদস্য। সাংস্কৃতিক নীতিমালার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত চলচ্চিত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার কারণে তিনি প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন। উদ্বোধনী মঞ্চে তাঁর বক্তব্যের সময় দর্শকদের তরফ থেকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। চেক প্রজাতন্ত্রের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিরুদ্ধে নীতিমালা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অর্থায়নকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগও তাঁকে সমালোচনার সম্মুখীন করেছে। তিনি বলেন, ‘যেসব রাষ্ট্রের মন্ত্রী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেন, তাঁরা আসেন আবার চলে যান—কিন্তু সাহিত্য থেকে যায়।
পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন ছিল চেক লেখক রাদকা ডেনেমারকোভার ক্ষেত্রে। তিনি অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ছিলেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, সংস্কৃতি ধ্বংসকারী মন্ত্রীরা আসলেও সাহিত্য টিকে থাকে। ইউরোপে ডানপন্থার উত্থান এবং চেক সরকারের মন্ত্রিসভায় সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাজনীতি ও সাহিত্যকে আলাদা করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তার বক্তব্যের পর উপস্থিত দর্শকেরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দিয়ে তাকে অভিবাদন জানান। এছাড়া ডেনেমারকোভা সাহিত্যের শক্তিকে পুঁজি করে জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার প্রসারে সাহসের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে ডেনেমারকোভা প্রশ্ন করেন, ‘ইউরোপ যখন ক্রমশ উগ্র ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে, যখন চেক সরকারের দুই সাবেক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তা মন্ত্রিসভায় রয়েছেন, তখন রাজনীতি ও সাহিত্যকে আমি কীভাবে আলাদা করব।
বইমেলার পরিচালক ইউর্গেন বুস এবং জার্মান প্রকাশক ও বই বিক্রেতা সমিতির প্রতিনিধি সেবাস্তিয়ান গুগোলজ উদ্বোধনের আগের দিন একটি সংবাদ সম্মেলনে মেলা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এরপর চেক প্রজাতন্ত্রের প্যাভিলিয়নে একটি বিশেষ প্রেস ট্যুর অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষে পরিচালক ইউর্গেন বুস প্রতীকী হাতুড়ির আঘাতের মাধ্যমে ২০২৬ সালের এই বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আজ বুধবার থেকে মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
এই মেলার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রাঙ্কফুর্ট ছিল ইউরোপের বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের মিলনস্থল। পরবর্তীতে ধর্মযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বইমেলার কেন্দ্রস্থল কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৫ সালের পরবর্তী সময়ে ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই প্রাচীন সংস্কৃতি পুনরায় ফিরে আসে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাউল গির্জায় ২০৫টি প্রকাশনার ৮৪৪টি বই নিয়ে আধুনিক ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পথচলা শুরু হয়।
বর্তমানে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা শুধু বইয়ের বাণিজ্য নয়, বরং চলচ্চিত্র, গেমস্ ও প্রযুক্তিসহ সৃজনশীল শিল্পের অন্যতম বড় বৈশ্বিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর অক্টোবরে মাইন নদীর তীরবর্তী এই শহরটি সারা বিশ্বের লেখক, প্রকাশক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখান থেকেই নতুন ব্যবসায়িক মডেল ও বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতার যাত্রা শুরু হয়, যা বৈশ্বিক প্রকাশনা জগতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।