সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই, আপনার পেশা কী? এই প্রশ্নের বিপরীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাওয়া যায় একটি অদ্ভুত উত্তর, ‘অমুক ভাইয়ের সঙ্গে আছি’। এই ‘ভাই’ পরিচিতিটি এখন যেন পেশা ও পরিচয়ের চেয়েও শক্তিশালী। আসলে এই ‘ভাই’রা এলাকায় মাস্তান বা নেতা হিসেবে পরিচিত, যারা ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন। এসব চাঁদাবাজ এতটাই শক্তিশালী যে, পুলিশও তাদের ধরতে ভয় পায়। যখনই কোনো অভিযানের খবর আসে, তখন উপরমহলে খবর পাঠানো হয় যে তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পপতি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবাই এই চক্রের কাছে জিম্মি। ব্যাংক থেকে শুরু করে অলিগলি, এমনকি ফুটপাতের ব্যবসায়ীদেরও মোটা অংকের চাঁদা দিতে হচ্ছে এসব গ্রুপকে।
চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্ক এখন ওপেন সিক্রেট। সরকার বদলালেও এই ফরম্যাট বদলায় না, বরং নতুন রূপে ফিরে আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যান চলাচল, এমনকি বালুমহাল বা ইজারার প্রতিটি ক্ষেত্রে এই চক্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন অস্ত্রধারী গ্রুপকে ব্যবহার করে এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখানে ব্যবসা করতে এসে অস্থিরতায় ভুগছেন। তাদের শুধু মাসোহারা দেওয়াই নয়, অনেক সময় নিম্নমানের মালামাল কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে হামলা ও নির্যাতনের খড়্গ। বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানেও দখলের ঘটনা ঘটছে, যা জনমনে তীব্র আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থার পেছনে মূল কারণ প্রশাসনিক দুর্বলতা। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি প্রশাসনিক সহায়তা না পায় বা বদলি হওয়ার ভয়ে থাকে, তবে তার পক্ষে এসব মাস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা এ বিষয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আপনারা সবসময়ই আমাদের দোষারোপ করেন। আপনারা বলেন আমরা দেখেও দেখি না! কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতা ও কষ্টের দিকটিও বিবেচনা করা উচিত। প্রমোশন বা পোস্টিং কেনাবেচার মাধ্যমে যখন একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পান, তখন তাকে পুঁজি তোলার চাপ নিতে হয়। আর সেই পুঁজি তুলতে গিয়েই তাকে চাঁদাবাজদের সঙ্গে আঁতাত করতে হয়।’
আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও ইদানীং দখলবাজির নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ কমে আসছে। ঢাকায় একজন আইনপ্রণেতাকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া টেন্ডার বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিদেশগামী যাত্রীদের ছাড়পত্র পাওয়া পর্যন্ত সবখানেই এই ‘ভাই’ নেটওয়ার্কের আধিপত্য রয়েছে। কমিশন বাণিজ্যের ধরনও পাল্টেছে; আগে যা বিদেশি ব্যাংকে জমা হতো, এখন তা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে, ফলে ঝুঁকি কমছে এবং ধরা পড়ার সম্ভাবনাও কমে আসছে।
কবরস্থানের জায়গা পাওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি স্তরে এই চাঁদাবাজদের ছায়া পড়েছে। রাজনৈতিক মদত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার এই চক্র ভাঙা আজ সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। দেশের শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই মানুষ এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চায়। যতক্ষণ না এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অশুভ আঁতাত বন্ধ হবে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব হওয়া কঠিন। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অপরাধী শনাক্ত হলেও তাকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না, যা রাষ্ট্রের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।