স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শহর প্যারিসের রাজপথে সম্প্রতি যে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই নগরীর বুকে সহিংসতার চিহ্নগুলো মূলত রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গভীর সংকটেরই প্রতিফলন। ১৭ অক্টোবর কেন্দ্রিক বিক্ষোভের জেরে ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তীব্র জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে সরকারি ভবনে হামলা ও সংঘর্ষের মতো ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী। আজ সকালে প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পানি এসেছে। বাগানের মতো সুন্দর এই শহরের বুকে সহিংসতার চিহ্ন দেখে মনে হয়েছে, সভ্যতার সংকট কখনো কখনো তার সবচেয়ে সুন্দর মুখের ওপরই আঘাত হানে। প্যারিস কেবল ফ্রান্সের রাজধানী নয়; এটি স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শিল্প ও মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ যখন সহিংসতা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের রূপ নেয়, তখন তার দায় কে বহন করবে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
এই সহিংসতার দায়ভার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সরাসরি উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ওপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে, বিরোধী নেতা জ্যঁ-লুক মেলেশোঁসহ বামপন্থীরা পুলিশের কৌশল এবং বলপ্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেন ও জর্দান বারদেলা এই পরিস্থিতিতে কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিকে সামনে এনেছেন। এই বিপরীতমুখী অবস্থান প্রমাণ করে, নিরাপত্তার ইস্যুটি এখন ফরাসি রাজনীতিতে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করেছে। কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে পরিকল্পিত সহিংসতার জন্য দায়ী করা যায় না। হামলাকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ, পূর্বপরিকল্পনা কিংবা অর্থায়নের কোনো প্রমাণ আছে কি।
ইতিহাসের পাতায় ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব আজও একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। রাজতন্ত্রের বৈধতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সেই বিপ্লব আধুনিক গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শক হলেও এর অন্ধকার অধ্যায়ে ছিল রক্তপাত ও প্রতিহিংসা। ২০১৮ সালের ‘হলুদ জ্যাকেট’ বা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের স্মৃতি আজও সতেজ। জ্বালানি মূল্য ও করনীতির বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন দ্রুতই জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছিল। এবারও ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের আড়ালে সংঘটিত অপরাধগুলো কি পূর্বপরিকল্পিত, নাকি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা—তা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ কি সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল, নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতা রয়েছে, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাকি সেইসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী, যারা প্রতিবাদের আড়ালে অপরাধ সংঘটিত করে। ২০১৮ সালের এরষবঃং লধঁহবং বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনও দেখিয়েছিল, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভ কীভাবে একটি জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও করনীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হয়। পুলিশ কি যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকলে তার দায় কে নেবে।
২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অস্থিরতা নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। আগামী বছরের ১৮ এপ্রিল নির্বাচনের প্রথম দফা এবং ২ মে দ্বিতীয় দফা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বর্তমান পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সরকার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিতে পারে, আবার বিরোধীরা সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাকে পুঁজি করার সুযোগ খুঁজবে। নিরাপত্তার দাবি ও নাগরিক অধিকারের বিতর্ক—এই দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করছে। তবে রাজনৈতিক স্বার্থ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করা জরুরি, যাতে প্রকৃত সত্য আড়াল না হয়। ফলে বর্তমান সহিংসতা নির্বাচনী বিতর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক সুবিধা, রাজনৈতিক দায় এবং অপরাধমূলক পরিকল্পনা-তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
সবশেষে এটি পরিষ্কার যে, কোনো রাজনৈতিক দাবিই নিরীহ মানুষের ওপর হামলা বা সম্পদ ধ্বংসের বৈধতা দেয় না। প্রতিবাদ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু ভাঙচুর ও লুটপাট কোনোভাবেই এর অংশ হতে পারে না। একজন শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ধ্বংস করে বা সাধারণ নাগরিককে আতঙ্কে রেখে কোনো ন্যায়সংগত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয় না। প্যারিসের গণতন্ত্র ও নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে একদিকে যেমন শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বিপ্লবের নামে নৈরাজ্য আর শৃঙ্খলার নামে নাগরিক অধিকার হরণ—উভয়ই দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।