1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় বিপর্যয়ের চরম ধাক্কা এখনও বাকি

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে যে তীব্র অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনও আসা বাকি বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আগামী দিন ও মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর আরও বিশাল চাপ তৈরি হতে পারে। কাতারের কাছ থেকে যেভাবে বিমান উপহার পেয়েছিলেন ট্রাম্প।

সোমবার দোহায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে বক্তব্য প্রদানকালে কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি স্পষ্ট ভাষায় জানান, জ্বালানির ক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায় এখনও সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আগামী মাসগুলোতে বৈশ্বিক বাজারে এর ভয়াবহ প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাঝুঁকি ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা

কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি তার বক্তব্যে কাতার এবং সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের সামনে বিদ্যমান নিরাপত্তাঝুঁকিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর চরম হুমকি সৃষ্টি হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটার স্পষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এবং এর জবাবে তেহরানের আঞ্চলিক বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রধানতম ধমনী হলো এই হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি সাধারণ বাণিজ্য ও উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়।

রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্সে হামলা এবং কাতারের শিক্ষা

গত মার্চে কাতারের সুবিখ্যাত রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্সে ইরানের নজিরবিহীন হামলায় দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোগত স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থাপনা পূর্বের পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বা মেরামত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ওই আকস্মিক হামলার বিষয়ে দোহায় জানতে চাওয়া হলে উপ-প্রধানমন্ত্রী আল থানি বলেন, তারা এই হামলায় বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন।

তবে দুর্ভাগ্যজনক সেই ঘটনার পর ইরানের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কাতারের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে অনেক আলোচনা ও কূটনৈতিক সেশন হয়েছে বলেও জানান শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। এই অপ্রত্যাশিত আক্রমণ থেকে কাতার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেকোনো সম্ভাব্য বা আকস্মিক হামলা থেকে দেশের সমস্ত জাতীয় গুরুত্ব বহনকারী স্থাপনা ও সম্পদ নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখতে পর্যাপ্ত সর্বাধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট ফি আরোপের তীব্র বিরোধিতা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পথ অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজের ওপর কোনো প্রকার টোল বা ট্রানজিট ফি ধার্য করার বিরুদ্ধে কাতার সরকারের শক্ত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন উপ-প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে জানান, এ ধরনের কৌশলী ট্রানজিট ফি কোনোভাবেই আরোপ করা সঠিক কাজ হবে না। এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট নিয়ে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা চূড়ান্ত বিচারে সারা বিশ্বের সাধারণ পণ্য ভোক্তাদের পকেটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি সতর্ক বার্তা দেন।

ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও কূটনীতি অব্যাহত

রাস লাফানের সামরিক হামলার পরও তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রেখেছে দোহা। এ বিষয়ে আল থানি তার বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, তারা পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথ কখনোই রুদ্ধ বা বন্ধ করেন না। দুই দেশের কৌশলগত ভূ-রাজনীতিতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত বিভিন্ন প্রশাসনিক পর্যায়ে কার্যকর আলোচনা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

উদ্বুদ্ধ সামরিক হামলার পূর্বে ইরানের সঙ্গে কাতারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দীর্ঘদিনের একটি মজবুত ও আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক হিসেবে আখ্যায়িত করেন আল থানি। তিনি দুই রাষ্ট্রের যৌথ মালিকানাধীন বিশাল সামুদ্রিক পার্সিয়ান উপসাগরের অভিন্ন গভীর তলদেশীয় গ্যাসক্ষেত্র এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও ফোরামে তুলে ধরেন।

সম্ভাব্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলসহ সমস্ত সংশ্লিষ্ট সংঘাতী পক্ষগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা অর্জনে কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের যৌথ মধ্যস্থতা কার্যক্রম সফলতা লাভ করবে বলে তিনি জোরালো আশা প্রকাশ করেন। তবে এই অঞ্চলে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংলাপ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন আল থানি। এ ক্ষেত্রে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং আন্তর্জাতিক মিত্র দেশসমূহকে সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রথমত পারস্পরিক বিশ্বাসের মেলবন্ধন গড়ে তুলতে হবে।

ভবিষ্যতে আঞ্চলিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত পুরোপুরি এড়ানোর উদ্দেশ্যে ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন আল থানি। এ ক্ষেত্রে কয়েক দশকের বৈরিতার পর ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে গড়ে ওঠা সহযোগিতার উদাহরণ তুলে ধরেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী। ইউরোপীয় ইতিহাসের সেই দৃষ্টান্ত টেনে তিনি বলেন, ইরান ভূ-রাজনৈতিকভাবে তাদের নিকট প্রতিবেশী। ফলে তাদের পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করার টেকসই উপায় নিজেদেরই বের করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্ধিত সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

আমেরিকার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারের কয়েক দশকের পুরনো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন আল থানি। তার দাবি, গত তিন থেকে চার দশকে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা সামরিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির ফলে ৯০ শতাংশের বেশি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ বিমান ঘাঁটির সার্বিক সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে বৃহৎ উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এই কৌশলগত ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাসদস্যদের পাশাপাশি অন্যান্য পশ্চিমা অংশীদার দেশের সামরিক কর্মীরাও কৌশলগত দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। গত কয়েক মাসের উত্তপ্ত সংঘাতের সময়ে ইরান এই আল উদেইদ ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করেছিল।

আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক জোট

কাতার সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মার্চের শুরুর দিকে একটি রক্তক্ষয়ী আক্রমণের সময় কাতার সফলভাবে ইরানের দুটি উন্নত যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সমর্থ হয়েছিল। এ ছাড়াও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন একটি সমন্বিত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট গড়ে তোলার বহুমাত্রিক পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেছেন শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। তিনি জানান, আধুনিক কাতার এখন সামরিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নতুন প্রযুক্তির ড্রোনবিরোধী প্রতিরোধ এবং উচ্চমাত্রার সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করছে।

উপ-প্রধানমন্ত্রী আল থানি আরও বলেন, আজ আমি আনন্দের সঙ্গে আরও ঘোষণা করছি, শিগগিরই আমরা একটি নতুন অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেব। তবে দ্রুতই আত্মপ্রকাশ করতে যাওয়া এই বৃহৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন দেশ অংশীদার হচ্ছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি।

বক্তব্যের শেষাংশে দোহার শীর্ষ এই নীতিনির্ধারক জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো আঞ্চলিক বিরোধে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালন করার অর্থ এই নয় যে নিজেদের জাতীয় ভূখণ্ড সুরক্ষার সামরিক প্রস্তুতিতে কোনো শিথিলতা আনা হবে। কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, তাদের শান্তি আলোচনার চেষ্টার অর্থ কখনই এটি নয় যে যেকোনো সম্ভাব্য প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের জন্য তারা নিজেদের প্রস্তুত রাখবে না।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun