বিশেষ সফরে সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর পরিদর্শনে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিনব্যাপী এই সফরে তিনি সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট ও সংলগ্ন এলাকা আকাশপথে পরিদর্শন করছেন। এর পাশাপাশি মোংলা বন্দরের নতুন জেটি, প্রস্তাবিত চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বন্দরকেন্দ্রিক সার্বিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সরজমিনে ঘুরে দেখার কথা রয়েছে তাঁর।
নির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সকাল সাড়ে ৮টায় তাঁর বাসভবন থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন এবং সকাল ৯টায় হেলিকপ্টারযোগে সুন্দরবনের পথে যাত্রা করেন। সকাল ১০টার দিকে তিনি আকাশপথে হিরণ পয়েন্ট ও আশপাশের সুন্দরবন এলাকা ঘুরে দেখেন। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করে নৌপথে বানৌজা মোংলার উদ্দেশে রওনা হন। দুপুরে মোংলা জেটিতে পৌঁছে তিনি ওয়ার্ড রুমে অবস্থান নেন।
দুপুরের খাবার ও বিরতির পর দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে ওয়ার্ড রুমের সভাকক্ষে আয়োজিত বৈঠকে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। অপরাহ্নে তিনি মোংলা বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম এবং নতুন জেটি নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করেন। বেলা ৩টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখার কথা রয়েছে তাঁর। সফর শেষে বিকাল ৪টায় মোংলার হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে বিকাল ৫টায় তাঁর রাজধানীতে পৌঁছানোর কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে। মধ্যাহ্নবিরতির পর দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে ওয়ার্ড রুম সভাকক্ষে আয়োজিত সভায় অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকার সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির লক্ষ্যে একটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই এলএনজি পাইপলাইনের মাধ্যমে মোংলায় এনে সেখানকার অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হবে। স্থানটি চূড়ান্ত করার উদ্দেশ্যে গত আগস্টে নৌপরিবহনমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল এলাকাটি পরিদর্শন করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শনের পর স্থান চূড়ান্ত হলে শুরু হবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগে নির্মিতব্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করে সেখানকার শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেখানে সম্ভাব্য শিল্পকারখানা, বিনিয়োগ এবং দেশের অর্থনীতিতে এর সুফল নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
মোংলা বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা) একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গত ১২ অক্টোবর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানায়, এই চুক্তির আওতায় চীন সরকার ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন চীনা ইউয়ান ঋণ দেবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ এই ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্মসচিব আলিয়া মেহের এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের পক্ষে সহকারী মহ ব্যবস্থাপক ফেংজুন তিয়ান স্বাক্ষর করেন। এই প্রকল্পের অধীনে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার ইয়ার্ড, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ডসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি সংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার আলী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বন্দরের চ্যানেলে সঠিক নিয়মে ড্রেজিং করা গেলে নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং বড় জাহাজ অনায়াসে চলাচল করতে পারবে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পর্যটনশিল্পের প্রসারের কথা তুলে ধরেছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা। সুন্দরবনের পর্যটন ব্যবসায়ী ও লঞ্চ বডি মালিক সমিতির সভাপতি দিদারুল আলম জানান, আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হলে অঞ্চলে ইকোট্যুরিজমের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। অন্যদিকে মোংলা বণিক সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান মনে করেন, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য বিস্তারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর তাকে আরও গতিশীল করবে।
বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান জাহানারা অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী মাহবুবুর রহমান মানিক বলেন, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর হলে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ উপকৃত হবে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসবে বলে জানান খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী হেলাল।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, চীনের বিনিয়োগকারীরা মোংলায় বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং মোংলা ইপিজেডে বিশেষ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল দেওয়া হয়েছে। শিল্পকারখানা স্থাপন ও পারস্পরিক লাভজনক বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি মোংলা বন্দরের সক্রিয়তা বৃদ্ধি, মোংলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ও সড়ক যোগাযোগের মানোন্নয়নের দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।