1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন

ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

ইউরোপে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে একের পর এক তাপপ্রবাহ আঘাত হানে।

ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকরা ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রার উপাত্ত এবং মৃত্যুহার বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এসব শহরে ৫০ হাজার ৩৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৩২ হাজার ৬০০টি মৃত্যুর পেছনে সরাসরি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের দায় রয়েছে। অর্থাৎ, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি না পেলে এই বিশাল প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬০০-এর বেশি মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বয়স্কদের পাশাপাশি বাইরে কাজ করা শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিরাও তীব্র গরমে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন। এর অর্থ, প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত কারণে গরম পড়লেও মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা সেই তাপকে আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী করে তুলছে। এতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও ঘনঘন ঘটার প্রবণতা বাড়ছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে প্রাণ হারানো মানুষ এবং শোকাহত পরিবার। পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের কিছু এলাকাও নজিরবিহীন তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে। গবেষকেরা বলছেন, তাপপ্রবাহের ক্ষতি কমাতে সরকারগুলোর দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

নেচার হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৬ বছরের মধ্যে তাপজনিত মৃত্যুর দিক থেকে এ বছরটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যার অর্থ হলো শহরের বাইরের গ্রামীণ এলাকায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে শহরের বাইরের জনবসতিতে তাপের প্রভাব এই হিসাবের আওতায় আসেনি।

২০২৬ সালের মে মাসের শেষ দিক থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ইউরোপে রেকর্ড পরিমাণ উষ্ণতা লক্ষ্য করা গেছে। মে মাসের শেষ দিক থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত মহাদেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়া বিরাজ করে।

বিশেষ করে ১৭ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত সময়টিতে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা পুরো গ্রীষ্মের তাপজনিত মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। পশ্চিম ইউরোপে গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দিনে কয়েকটি দেশের তাপমাত্রা ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি উঠে যায়।

দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইতালিতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যেখানে ১৩ হাজার ৩০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তালিকায় পরবর্তী স্থানে থাকা ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে যথাক্রমে ৭ হাজার ২৬৮ জন, ৬ হাজার ৮২৪ জন এবং ৬ হাজার ৩৪০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যুক্তরাজ্যে ৪ হাজার ৩৫৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫৩৫টির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া স্পেনের ক্ষেত্রে তাপজনিত মৃত্যুর ৭৭ শতাংশই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হয়েছে বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাজ্যে অনুমান করা মৃত্যুর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৫ জনের মৃত্যুর সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বয়সভেদে মৃত্যুর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। ৮৫ বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার ৫০২, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৫ শতাংশ। তবে এই প্রাণহানি কেবল প্রবীণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ৬৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ছয় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যেও আট শতাধিক মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে। শরীর অতিরিক্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং হৃদরোগ ও কিডনিজনিত জটিলতায় এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত তাপ শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এতে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর চাপ বাড়তে পারে। আগে থেকে হৃদ্‌রোগ, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষের ঝুঁকি আরও বেশি।

গবেষকদের দাবি, চলতি শতকের শুরুর দিকে তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে। ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু গবেষক ক্লেয়ার বার্নস এ বছরকে ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গ্রীষ্ম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একইসঙ্গে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের পিয়ের মাসেলো সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন কেবল ঐতিহ্যগতভাবে উষ্ণ অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং উত্তর ইউরোপের শীতল এলাকাগুলোতেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে জরুরি অভিযোজন কৌশলের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা শহরগুলোতে সবুজায়ন বৃদ্ধি, তাপ শোষণকারী উপাদানের ব্যবহার কমানো, নিরাপদ শীতল আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। তবে গবেষকদের ভাষ্যমতে, কেবলমাত্র অভিযোজন দিয়ে এই ঝুঁকি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দ্রুত হ্রাস করার কোনো বিকল্প নেই। ইউরোপের এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী সংকট নয়, বরং এটি বর্তমানে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। শহরে গাছপালা ও সবুজ এলাকা বাড়ানো, তাপ শোষণকারী পৃষ্ঠের পরিমাণ কমানো, পর্যাপ্ত ছায়া ও পানির ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত গরমের সময় নিরাপদ শীতল আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়িঘর ও হাসপাতালকে তীব্র তাপ মোকাবিলার উপযোগী করে তোলাও জরুরি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun