সকালে ঘরে ফেরার কথা ছিল মোহাম্মদ ইয়াছিনের। গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকেও মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে সবজি নিয়ে টেকনাফে রওনা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। মা শওকত আরার সাথে সেটিই ছিল তার শেষ কথা। মায়ের প্রত্যাশা ছিল সকালের আলো ফুটলেই ছেলে ঘরে ফিরবে, কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুরতায় সকালের আলোতে ছেলের নিথর দেহ ফিরল বাড়িতে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে মা শুনলেন, ছেলে আর নেই। মাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী সকালে, কিন্তু জীবিত নয়, নিথর দেহে। সেখান থেকে বৃহস্পতিবার চকরিয়ায় ফেরেন। রাতেই পিকআপে সবজি তুলে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা দেন ইয়াছিন। বাবা মোহাম্মদ দুলাল লামায় ব্যবসা করেন। বাড়ির উঠানে ছেলের নিথর দেহের পাশে স্বজনদের কান্নায় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, একজন তরুণের মৃত্যু কীভাবে তছনছ করে দিতে পারে একটি পরিবারকে।
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়া সবুজ পাহাড় এলাকায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। একটি যাত্রীবাহী বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় ইয়াছিনের চালানো পিকআপ ভ্যানটির। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১৮ বছর বয়সী ইয়াছিনসহ দুজন। নিহত অন্যজনের নাম আবদুল্লাহ (২৭), যার বাড়ি টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল এলাকায়। ঘরের বারান্দা থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ। দুর্ঘটনায় নিহত অপর ব্যক্তি আবদুল্লাহর বয়স ২৭ বছর।
নিজের একটি পিকআপ গাড়ি কেনার তীব্র স্বপ্ন ছিল ইয়াছিনের।
আগে ইজিবাইক চালালেও, মা-বাবার কাছে বায়না ধরেছিলেন নিজস্ব একটি পিকআপের জন্য। ছেলের সেই স্বপ্ন পূরণে মাত্র ১৫ দিন আগে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে তাকে গাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। গাড়ি কেনার পর প্রথম ১০-১২ দিন চালক দিয়ে চালালেও, ঘটনার দিন বুধবার ইয়াছিন নিজেই চালকের আসনে বসেন। সেদিন একটি ভাড়া নিয়ে চট্টগ্রাম গিয়ে বৃহস্পতিবার ফিরে আসেন, আর রাতের সেই যাত্রাটিই হয়ে ওঠে তার শেষ পথচলা। ছেলেকে আর কোনো দিন ফিরে পাবেন না, এ সত্য যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি।
পরিবারের চার ভাইবোনের মধ্যে ইয়াছিন ছিলেন তৃতীয়। তাদের পৈতৃক নিবাস বান্দরবানের লামা উপজেলায় হলেও, গত ২০ বছর ধরে তারা চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা এলাকায় নানাবাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ইয়াছিনের বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী, বড় বোন জান্নাতুল নাইমা (২২) এবং ছোট ভাই মোহাম্মদ রবিউল হোছাইন (১৫) রাজমিস্ত্রির কাজ করে। বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন (২৬) মালয়েশিয়াপ্রবাসী।
শুক্রবার বিকেলে সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা এলাকার নিজ নানাবাড়ির উঠানে শোকাতুর স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমেছিল। ইয়াছিনের নিথর দেহ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা শওকত আরা। অকাল এই মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার। বিকেলে শাহপুরা জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় সামাজিক কবরস্থানে তাকে দাফন সম্পন্ন করা হয়। শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন শওকত আরা।
মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে যে পিকআপ গাড়িটি ঘিরে ইয়াছিন তার ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন বুনেছিলেন, সেই গাড়িটিই শেষ পর্যন্ত তার প্রাণ কেড়ে নিল। পরিবারের যে সদস্যটি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তার সব স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল।