ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের যে খুচরা মূল্য, তার সঙ্গে খামারিদের বিক্রয়মূল্যের কোনো মিল নেই। বর্তমান বাজারব্যবস্থায় প্রান্তিক খামারিরা চরম লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও খামারিরা পাচ্ছেন মাত্র ১৩৪ টাকা। এই হিসাবে কেজিতে ব্যবধান ৫৬ টাকার। অন্যদিকে, গত বুধবার ঢাকার বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, অথচ খামার পর্যায়ে এর দাম ছিল মাত্র ১০২ টাকা। অর্থাৎ ডজনপ্রতি ব্যবধান ৫৩ টাকা। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) ঢাকার বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকায়।
খামারি শাফিউর রহমান ঢাকা পোস্টকে জানান, তিনি ১ হাজার ২০০ মুরগি তুলেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজারটি বিক্রি করার পরও তাকে ৫০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। কিছু মুরগি মারা গেছে এবং ৭০টির মতো এখনো খামারে রয়ে গেছে। তিনি জানান, গত দুই মাসে ব্রয়লার মুরগির খাবারের দাম বস্তাপ্রতি ২২৫ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ৭৮৫ টাকায় ঠেকেছে। খাবারের পাশাপাশি ওষুধের বাড়তি খরচ এবং বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় লোকসানের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না তারা। নিজের খামারের লোকসানের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ১ হাজার ২০০টি মুরগি তুলেছিলেন। বাকি মুরগির কিছু মারা গেছে, আর প্রায় ৭০ কেজি মুরগি এখনো খামারে রয়েছে।
ডিম উৎপাদনকারী খামারি আরিফুল ইসলামও একই সংকটের কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, তার খামারে প্রতি পিস ডিম ৮ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে। ডিমের খাবারের দাম বস্তাপ্রতি ৩২৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে ২ হাজার ৯০০ টাকার উপরে চলে গেছে। ফলে ডিম বিক্রি করে বিশেষ কোনো লাভ তো হচ্ছেই না, বরং মূলধনের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। নিয়মিত লোকসানে চলতি মূলধন কমে যাওয়ায় নতুন করে বাচ্চা তোলা ও খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মুরগির বাজারের অস্থিরতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী আফজাল জানান, কাপ্তান বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই মূলত মুরগির দাম ওঠানামা করে। সেখানে রাতে ও সকালে ভিন্ন ভিন্ন দামে কেনাবেচা হয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহের তারতম্য দামের এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ।
উৎপাদক পর্যায়ে মুরগির খাবার ও ওষুধের ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, সেই অনুপাতে বিক্রয়মূল্য না বাড়ায় প্রান্তিক খামারিরা আর্থিক চাপে পিষ্ট হচ্ছেন। খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর মধ্যবর্তী পর্যায়ে দামের এই বড় ধরনের ব্যবধান কেন তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব অথবা সরবরাহ শৃঙ্খলার ত্রুটি এই পার্থক্যের জন্য দায়ী হতে পারে। খাবারের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিই কি এর প্রধান কারণ, নাকি সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও দামের ব্যবধান বাড়াচ্ছে।
খামারিদের ভাষ্যমতে, উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ভারসাম্যহীনতা তাদের লাভের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। একদিকে ভোক্তাদের চড়া দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে খামারিরা তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাচ্ছেন না।
উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় পোল্ট্রি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বচ্ছ করা এবং বাজারমূল্যের অসামঞ্জস্য দূর করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতি-নির্ধারকদের উচিত দ্রুত এই খাতটি খতিয়ে দেখে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।
সূত্র: ঢাকা পোস্ট।