ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের ইতিহাস পর্যালোচনায় তিনটি প্রধান কৌশল বারবার সামনে চলে আসে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ শুধু অর্থনৈতিক আধিপত্যই নয়, বরং উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মন ও মননের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা ধরনের অপ-কৌশল অবলম্বন করেছিল। এর মধ্যে প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, লুণ্ঠন এবং গণহত্যা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। বিশেষ করে ভারত ও অন্যান্য অঞ্চলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা সাধারণ সৈন্যদের ব্যবহার করেছে শুধু নিজেদের শাসন দীর্ঘায়িত করতে নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে। এর প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে আফ্রিকা মহাদেশ পর্যন্ত।
ইতিহাসে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের কর্মকাণ্ড একটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। এক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এর চাপে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স ডায়ারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনতে বাধ্য হয় এবং তাকে চাকরি থেকে অব্যাহিত দেয়। তবে এর পরপরই হাউস অব লর্ডস সেই নিন্দা প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জেনারেল ডায়ারকে কেবল সসম্মানে অবসরের সুযোগই দেয়া হয়নি, বরং অবসরভাতা ও রত্নখচিত তরবারিসহ নানা উপহার প্রদান করে তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল, যা তৎকালীন ব্রিটিশ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
ইউরোপীয় ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত চরিত্র ক্রিস্টোফার কলম্বাসের কার্যাবলিও এই ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর বাহামা দ্বীপপুঞ্জের গুণাহানি দ্বীপে অবতরণের পর কলম্বাসের যে আচরণ পরিলক্ষিত হয়, তা ইতিহাসবিদদের লেখায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তলোয়ারধারী স্পেনীয় নাবিকদের দেখে স্থানীয় আরাওয়াক জনগোষ্ঠীর মানুষরা অবাক হলেও তারা অতিথিপরায়ণ ছিল। তারা টিয়া পাখি, তুলার বল ও ইক্ষু-দণ্ড দিয়ে তৈরি বর্শার মতো উপহার দিয়ে এই অভ্যাগতদের স্বাগত জানিয়েছিল। তবে কলম্বাসের স্বার্থান্বেষী মাথায় ছিল অন্য পরিকল্পনা। তিনি স্থানীয়দের সরলতাকে পুঁজি করে তাদের বন্দি করে জাহাজে তুলে নেয়ার বর্বরোচিত সিদ্ধান্ত নেন, যাতে তাদের মাধ্যমে স্বর্ণের খনির অবস্থান জানা সম্ভব হয়।
পরবর্তী অভিযানে কলম্বাস ১৭টি জাহাজ ও বারশ’রও বেশি সঙ্গী নিয়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ফিরে আসেন। হাইতিতে স্বর্ণের খনি অনুসন্ধানে ব্যর্থ হয়ে তিনি স্থানীয়দের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করেন। ১৪৯৫ সালে তিনি একটি এলাকা ঘেরাও করে ১৫শ আরাওয়াক নারী, পুরুষ ও শিশুকে জোরপূর্বক বন্দি করেন। তাদের মধ্য থেকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পাঁচশ জনকে বাছাই করে স্পেনে দাস হিসেবে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। অবশিষ্ট তিনশ জন সেখানে পৌঁছানোর পর গির্জার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। এ ঘটনার পর কলম্বাস তার ডায়েরিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, পবিত্র ত্রয়ীর নামে এখন থেকে বিক্রয়যোগ্য সকল দাসকে স্পেনে পাঠানো সম্ভব।
মৌরিতানিয়ার আরগুইন অঞ্চলে ১৪৪৮ সালে পর্তুগিজদের শুরু করা দাস ব্যবসা প্রায় চারশ বছর টিকে ছিল। ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র একবার কোনো দেশ দখল করতে পারলে সেখানে তাদের আধিপত্য ও শোষণের কাঠামো পাকাপোক্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইউরোপীয় শাসক শ্রেণি কলম্বাসকে আবিষ্কারক বা বীর হিসেবে চিত্রিত করলেও, মূলত তার কার্যাবলি ছিল লুণ্ঠন ও অমানবিক দাসত্বের এক জঘন্য উদাহরণ। স্বর্ণের নেশায় স্থানীয়দের দাস বানানো এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই বাণিজ্য প্রসারের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার ঘটিয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি-৩। চাকরির আরও তথ্য: দেশে-বিদেশে এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়ার ফলে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স জেনারেল ডায়ারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হয় এবং তাকে চাকরি থেকে ‘অব্যাহতি’ দেয়া হয়; কিন্তু অনতিবিলম্বে ‘হাউস অব লর্ডস’ সে নিন্দা প্রস্তাব প্রত্যাহার। 6. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটিশ নাগরিক একটি রত্নখচিত তরবারি ও চাঁদা তুলে সংগৃহীত ২৬,৩১৭ পাউন্ড উপহার দিয়ে বীরের সম্মান দান করে।৭ এই কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে উপনিবেশিত জনগণের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের হীনদৃষ্টিভঙ্গি যেমন প্রকটিত হয়, তেমনি ভারতীয়দের হত্যা করার জন্য ভারতীয় সৈন্য ব্যবহারের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এই ভারতীয় গরিব সৈন্যদের শুধু ভারতবর্ষে নিজেদের শাসন জারি রাখার জন্যই ব্যবহার করেনি, ‘দুনিয়াব্যাপী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখতে, বিশেষত পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় এবং উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ। 8. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতদসত্ত্বেও, ফার্গুসনের স্বপ্রণোদিত প্রশ্নের কিছুটা ন্যায্যতা আছে, কিন্তু তার উত্তরটি নিতান্তই অসম্পূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেননা, কোনো উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র বা তার পৃষ্ঠপোষকতাভোগী কোনো সশস্ত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো দেশকে ছলে বা বলে, কিংবা উভয় উপায়ে, একবার দখল করে উপনিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই, দখলীকৃত দেশ বা তার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির বশীভূত হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু তার আগে ইতিহাসের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য মনে রাখা প্রয়োজন যে, বিভিন্ন দেশ ও জনগোষ্ঠীর ওপর প্রাথমিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ, সেসব অঞ্চলে নিজেদের ‘উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতি’ বিস্তারের নামে, আসলে প্রতারণা।