বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়া প্রায় ৪৫ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৮০ কোটি মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম বা এমএসএমটি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপার্জিত এই অর্থের বড় একটি অংশ দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যয় করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে গঠিত এই বহুপক্ষীয় পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বিশ্বের ১৭টি দেশে উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৩৫ হাজার ৬০০ থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২৮০ জন শ্রমিক অবস্থান করছেন। নিয়ম অনুযায়ী ২০১৯ সালের মধ্যে এসব শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। এমএসএমটির তথ্যানুযায়ী, এই শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় অংশ চীনে রয়েছে, যাদের সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ৭০ হাজার হতে পারে। চীন সরকারিভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিভিন্ন অনুসন্ধানে সেখানে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের উপস্থিতি স্পষ্ট হয়েছে।
রাশিয়াতেও উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। এদের মধ্যে অনেককে সামরিক ড্রোন তৈরির কাজে যুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার পক্ষ থেকে কিছু শ্রমিককে শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানোর জন্য স্টুডেন্ট ভিসা ব্যবহারের কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। চীন উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে থাকলেও, ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
শ্রমিকদের উপার্জনের একটি বড় অংশ দেশটির সরকার নিয়ে নেয়। প্রতিবেদন মতে, অনেক শ্রমিকের বেতনের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের কর্মকর্তা লারা স্ট্র্যাংওয়েজ জানিয়েছেন, রুশ শ্রম মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত এই ব্যবস্থায় শ্রমিকরা চরম ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা, ঋণের জালে আটকে রাখা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এই শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও সীমিত চিকিৎসাসেবার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিদেশে কর্মরত আইটি কর্মীদের অবদানও এই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করছে। এমএসএমটির সদস্য দেশগুলো বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে যে, এই শ্রমিক নিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
উত্তর কোরিয়ার বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচি কেবল অভিবাসন বা শ্রমবাজারের বিষয় নয়; এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা এবং চীন-রাশিয়া-কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দেশটি তার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই প্রতিবেদনটি উত্তর কোরিয়ার বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৯ সালের মধ্যে তাদের প্রত্যাবাসনের সময়সীমাও নির্ধারিত ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, এবিসি নিউজ ও গ্লোবাল সিকিউরিটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাতিসংঘের উত্তর কোরিয়াবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর প্রচেষ্টা পর্যবেক্ষণ করাই এর অন্যতম কাজ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, মাছ ধরার বহরসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কাজ করার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে শ্রমিকদের হাতে তাদের উপার্জনের খুব সামান্য অংশ থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচিকে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে তুলনা করে আসছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধে সেনাও পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই পরিস্থিতি উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।