সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার সময় ফ্ল্যাটটিতে এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নিহতের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় এমপি নজরুলকে প্রধান আসামি এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে। এছাড়া মরিয়মের মামা ওবায়দুরকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
সোমবার বিকেলে আদালতের নির্দেশনায় গাজী নজরুল ইসলামের চার দিনের এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক শামসুজ্জোহা সরকার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী মরিয়মের পারিবারিক বিরোধ ও চিরকুটগুলো মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান নজরুলের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও বয়স বিবেচনায় জামিনের আবেদন করেন। আদালতে রিমান্ডের শুনানির পর গাড়িতে ওঠার সময় এমপি নজরুল নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন না এবং এটি একটি আত্মহত্যা।
শোকাতুর বাবা মাসুম বিল্লাহর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা মরিয়মকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। ঘটনার নেপথ্যে নিজের শ্যালক ওবায়দুরকে প্রধান ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে দায়ী করে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ওবায়দুরই মরিয়মকে প্রলোভন দেখিয়ে এবং নানা চাপের মুখে এমপি নজরুলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। তিনি জানান, বিয়ের আগে থেকেই ওবায়দুর কোচিংয়ের নাম করে মরিয়মকে বিভিন্ন স্থানে এমপি’র সঙ্গে দেখা করতে বাধ্য করত। রোববার বিকেলে এমপি নজরুলের ফোন পেয়ে তিনি দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় গিয়ে দেখেন তার মেয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে। ওই সময় তিনি মেয়ের বিছানায় একটি সুইসাইড নোটও খুঁজে পেয়েছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ পাঁচটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সাদা কাগজে লাল কালিতে লেখা রয়েছে, ‘ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেয়ার বিষয় নয়’ এবং ‘কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের’। এছাড়া জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা দুটি চিরকুটে আবেগ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ পাওয়া গেছে, যেখানে বিশ্বাসের প্রতিদান না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। হাতের লেখা যাচাই করে পুলিশ দেখছে কেন ভিন্ন ভিন্ন কালিতে এসব নোট লেখা হয়েছে। এমনকি ১২ জুলাইয়ের তারিখ দেওয়া একটি পাতায় ধর্মীয় আমল ও সূরার উল্লেখও রয়েছে।
ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর সোমবার দুপুরের দিকে মরিয়মের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর নিহতের পরিবার অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে হত্যাকাণ্ডের রহস্য ও সুইসাইড নোটগুলোর সত্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই মরিয়ম ফোনে তাদের ওপর চলা নির্যাতনের কথা জানাতেন। বিষয়টি নিয়ে মরিয়মের বোন ও মাসহ পরিবারের সদস্যরা মর্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের দাবি, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই মৃত্যুর মূলহোতাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশি তদন্ত এবং রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে এই ঘটনার পুরো রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আশা করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয় গাজী নজরুল ইসলামকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম স্ত্রী মাকছুদা দ্বিতীয় আসামি ও নিহত মরিয়মের মামা ওবায়দুর ৩ নম্বর আসামি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর এই সবের মূলহোতা হলো আমার শ্যালক ওবায়দুর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমপি’র সঙ্গে বিয়ে না হলে আজ এতকিছু হতো না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ সময় মরিয়মের বোন, মা-সহ পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে পরিবেশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যা বিভিন্ন সময়ে তাদের ফোনেও জানিয়েছিলেন মরিয়ম।