পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা। গাজায় চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি স্পেন ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলোর আগে নেওয়া বয়কট নীতিরই সম্প্রসারণ বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চালানো বরাবরই অবৈধ বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির অজুহাতে এই বয়কট কার্যকর হলেও, সমালোচকরা বলছেন এটি কেবল দায়সারা পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই বয়কটের তীব্র বিরোধিতা করে একে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একইসঙ্গে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডকেও তিনি একই অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোর এই বয়কটের জবাবে ইসরাইল কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটি জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এবং ১১ জন ব্রিটিশ এমপির ওপর ইসরাইল-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অথচ, বসতিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ দিলেও এই দেশগুলো ইসরাইল রাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি অব্যাহত রেখেছে।
এই বয়কটের অন্যতম আইনি ভিত্তি হিসেবে ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) পরামর্শমূলক মতামতকে সামনে আনা হয়েছে। আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের উপস্থিতি ও বসতি স্থাপনকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল। এছাড়া ১৯৬৭ সালের নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ নম্বর প্রস্তাবে যুদ্ধের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখলের অগ্রহণযোগ্যতার কথা স্পষ্ট বলা হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
১৯৭৯ সালে নিরাপত্তা পরিষদের ৪৪৬ নম্বর এবং ১৯৮০ সালে ৪৬৫ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ইসরাইলের বসতি নীতিকে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য অতীতে এই প্রস্তাবগুলোর পক্ষে ভোট দিলেও, বর্তমান সময়ে কেবল বসতি স্থাপনকারীদের ওপর দায় চাপিয়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীকে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সহিংসতা বসতি স্থাপনকারীদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনী পশ্চিম তীরে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যার প্রায় ২৫ শতাংশই শিশু। কেবল ২০২৬ সালেই প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৯ জন শিশু। এর মধ্যে ২৩ জন নিহত হয়েছেন বসতি স্থাপনকারীদের হামলায়।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৮৮০-এর দশক থেকেই জায়নবাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন চলছে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত এবং ১৩ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। তৎকালীন নেতারা জৈবিক যুদ্ধের আশ্রয় নিয়ে কূপে বিষ প্রয়োগের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছিলেন।
ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা এখন যে বাইবেলভিত্তিক যুক্তি দিচ্ছেন, তা আদতে ১৯৪৮ সালের আগে ও পরের জায়নবাদী নেতাদের দাবিরই পুনরাবৃত্তি। ডেভিড বেন-গুরিয়নের মতো নেতারাও একই ধরনের আধ্যাত্মিক দাবির ওপর ভিত্তি করে নিজেদের নীতি পরিচালনা করতেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানের নামকরণ—যেমন ‘অপারেশন কাস্ট দাই ব্রেড’ বা ‘পিলার অব ডিফেন্স’—সবই বাইবেলের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি তাদের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের নামকরণেও এই প্রবণতা স্পষ্ট।
বিশ্লেষকদের দাবি, আজকের বসতি স্থাপনকারীরা পোগ্রোম বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালালেও, ১৯৪৮ সালের বসতিস্থাপনকারীদের ভয়াবহতার তুলনায় তা ক্ষুদ্র। অথচ বিশ্বনেতারা এই ‘ছোট খেলোয়াড়দের’ শাস্তির আওতায় আনলেও বড় পরিসরের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্ত মূলত চলমান ইসরাইলি উপনিবেশবাদ থামানোর জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পশ্চিমা মহলে পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ও কঠোর নিন্দা ক্রমেই বাড়ছে—তবে পূর্ব জেরুজালেম বা গোলান মালভূমির বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাজায় ইসরাইলের ‘গণহত্যার’ প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে থাকা দেশগুলো এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও অন্যান্য দেশ যে বয়কট অনেক আগে শুরু করেছিল, তাতে যোগ দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর অর্থ হলো—আগের বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বয়কটের জন্য যথেষ্ট ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতের ওপরও বয়কটের ভিত্তি দাঁড় করিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাহলে এই ‘অসহায়’ বসতি স্থাপনকারীদের ওপরই কেন এত বেশি প্রতিক্রিয়ার বোঝা চাপানো হচ্ছে, যখন তারা এই ব্যাপক নিপীড়নের ক্ষেত্রে কেবল অপেক্ষাকৃত ছোট খেলোয়াড়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স উভয়ই ২৪২ ও ৪৬৫ নম্বর প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল; ফ্রান্স ৪৪৬ নম্বর প্রস্তাবের পক্ষেও ভোট দেয় এবং যুক্তরাজ্য ভোটদানে বিরত থাকে।