দীর্ঘ ১১ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে যখন তার বহনকারী বোয়িং ৭৪৭ ট্রাম্প-ওয়ান বিমানটি অবতরণ করবে, তখন থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে শি জিনপিংকে স্বাগত জানাবেন।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে সাউথ লনে আয়োজিত হবে রাজকীয় রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা। মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ ট্রাম্পেটের সুরের মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠানের শুরু হবে। সামরিক কুচকাওয়াজের অংশ হিসেবে আকাশে বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান এবং চারটি এফ-২২ র্যাপটর যুদ্ধবিমান মহড়া দেবে। এছাড়া সফরজুড়ে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও শি জিনপিং বিভিন্ন যৌথ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন, যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং ন্যাশনাল আর্কাইভে বিশেষ সফর।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষক ডেভিড পিয়ারসন ও অন্যান্য গবেষকদের মতে, ওয়াশিংটনে বাইরে উৎসবের আমেজ থাকলেও ভেতরে দুই দেশের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব প্রবল। একদিকে নিজের দেশে চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতা সংহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ৭৩ বছর বয়সী শি জিনপিং, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের নির্বাচনের সমীকরণ মাথায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি সাজাচ্ছেন।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ইস্যু এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য বিরতি চুক্তির মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হচ্ছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি নবায়ন হবে কি না। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের উদ্বৃত্ত এবার ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়ার পথে। এআই প্রযুক্তির চাহিদায় গত মাসে চীনের রপ্তানি ২৫ শতাংশ বেড়েছে এবং দেশটি আমদানির তুলনায় ১১৯ বিলিয়ন ডলার বেশি আয় করেছে।
প্রযুক্তি ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্ব চরমে। চীন সাত ধরনের রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করার পর আরও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর চাহিদার তুলনায় রেয়ার আর্থ সরবরাহ এখন বড় উদ্বেগের কারণ। এছাড়া, চীন এআই ও সাইবার স্পেসকে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের রণক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও চীনের হে লিফেংয়ের মধ্যে যৌথ এআই সংলাপ প্রতিষ্ঠায় আলোচনার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সবশেষে, বেইজিংয়ের সামরিক কর্মকর্তা ঝো বো ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্প অনুরোধ করলে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত চীন। যদিও এই সফর ঘিরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তবে নিউইয়র্ক টাইমসের অধ্যাপক মিনক্সিন পেইয়ের মতে, শি জিনপিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান অস্থির সময়কালটি সফলভাবে পার করে নিজেদের বিশ্বনেতা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজকীয় এই আয়োজনের পর ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং ম্যাডাম পেং লিউয়ান যৌথভাবে স্মিথসোশিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্ট পরিদর্শন করবেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বৃহস্পতিবার রাতে ইস্ট রুমে বর্ণাঢ্য রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং শুক্রবার রেড রুমে চা-চক্র ও ন্যাশনাল আর্কাইভে ঐতিহাসিক নথি পরিদর্শনের মাধ্যমে শেষ হবে এই মেগা সফর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এই অভূতপূর্ব সামরিক প্রদর্শনী, লালগালিচা ও রাষ্ট্রীয় আড়ম্বরের ঠিক পেছনেই জমাট বেঁধে রয়েছে এক মারাত্মক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষ করে পাল্টাপাল্টি শুল্ক, রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজে চীনের নিয়ন্ত্রণ, এআই নিয়ে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ এবং অদৃশ্য সাইবার হামলাসহ অনেক পুরোনো বিরোধের কোনো সুরাহা এখনো হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যের জটিল হিসাব-নিকাশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, সফরের প্রস্তুতি পর্বে ওয়াশিংটনের অগোছালো পরিকল্পনায় চীনা কর্মকর্তারা কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ক্লেয়ারমন্ট ম্যাককেনি কলেজের চাইনিজ লিডারশিপ পলিটিকস বিষয়ের অধ্যাপক মিনক্সিন পেই বলেন, শি জিনপিং নিজ দেশের জনগণের সামনে নিজেকে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী বিশ্বনেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান।