জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক নিরসনে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জাইমা রহমান তার ব্যক্তিগত মেধা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জাতিসংঘে পি-৩ পজিশনে নিযুক্ত হয়েছেন। তার যে পেশাগত প্রোফাইল রয়েছে, তার সঙ্গে এই পদটিই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দূরতম কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এর ওপরে পি-৪, পি-৫ বা ডিরেক্টর লেভেলের উচ্চপদ রয়েছে। এর বাইরে সাধারণত যে ধরনের অত্যাবশ্যকীয় নিরাপত্তা কর্মী, মিডিয়া ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা থাকেন, কেবল তারাই উপস্থিত ছিলেন।
মাহ্দী আমিন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আপনারা নিজেরাই দেখছেন যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। এ বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে কোনো চাকরি দেয়া হয়নি। এমনকি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী মিশনেও তার কোনো পদায়ন হয়নি। তিনি সরাসরি জাতিসংঘের সদরদপ্তরে, ইউনাইটেড নেশনস জেনারেল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন। জাতিসংঘের নিজস্ব নিয়মকানুন ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অধীনে তাদের নির্বাহী কার্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্সেস টিম সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এই আন্তর্জাতিক নিয়োগটি সম্পন্ন করেছে। তার নিয়োগের যাবতীয় প্রক্রিয়া ও আর্থিক সুবিধাদি জাতিসংঘ সরাসরি বহন করে, যেখানে সরকারের কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা থাকার সুযোগ নেই। যে কেউ চাইলে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে এই পদের স্বচ্ছতা যাচাই করতে পারবেন।
মাহ্দী আমিন পি-৩ পদের মানদণ্ড ব্যাখ্যা করে বলেন, জাতিসংঘের প্রফেশনাল কাঠামোতে পি-১ হলো নতুন স্নাতকদের জন্য, পি-২ এর জন্য ন্যূনতম দুই বছরের অভিজ্ঞতা লাগে এবং পি-৩ পদের জন্য প্রয়োজন হয় অন্তত পাঁচ বছরের মধ্যবর্তী পেশাগত অভিজ্ঞতা। জাইমা রহমান তার মেধা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই পদে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, অতীতে আমরা যে ধরনের রাজনৈতিক বা পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে আন্তর্জাতিক মিশনে পদায়ন কিংবা প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি দেখেছি, তিনি কিন্তু সেভাবে যাননি। তিনি বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধিদলেরও কোনো অংশে সম্পৃক্ত হননি। নিজের মেধার জোরে আন্তর্জাতিক পরিসরে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছানোকে বরং সাধুবাদ জানানো উচিত, কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালানো কাম্য নয়।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সফর শেষে সম্প্রতি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন জানান, এবার প্রধানমন্ত্রী গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সফর করেছেন। প্রতিনিধিদলের সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫ জন, যার মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ পদমর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও সফরজুড়ে প্রায় ৫০টির মতো পৃথক বৈঠকে অংশ নেন। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮০টিরও অধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিনিধিদলের বড় একটি অংশ দেশে ফিরে এলেও একটি টিম ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থান করছে, যেখানে টেকনোলজি ও ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাদের ধারাবাহিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মাহ্দী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও জাতিসংঘে অত্যন্ত ব্যস্ত ও কার্যকর সময় অতিবাহিত করেছেন। তিনি ৮টি কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং ৩টিতে বক্তব্য রাখেন। বিশেষ করে জাতিসংঘ উইমেন লিডার্স প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ করে তিনি বিশ্ব নারী নেতৃত্বের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফার্স্ট লেডিদের সামনে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য দর্শনের কথা উপস্থাপন করেন তিনি। একজন চিকিৎসক হিসেবে মিডওয়াইফারি সাইড ইভেন্টে তার মূল্যবান সমাপনী বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
পরিশেষে মাহ্দী আমিন বলেন, দীর্ঘ সময় পর জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ে নির্বাচিত একটি সরকারের প্রধান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক বিশাল পদক্ষেপ। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বৈশ্বিক কূটনীতিতে এই সফরটি ছিল আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার এক দৃঢ় প্রত্যয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সমতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে, যা আমাদের জাতীয় আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করেছে। আমরা টার্কিশ এয়ারওয়েজে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাই এবং ফেরার সময় এমিরেটস এয়ারলাইন্সে দেশে ফিরে আসি। তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে প্রতিটি দেশের সঙ্গে আমরা সুদৃঢ় অংশীদারিত্ব চাই, বিনিয়োগ চাই এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ চাই; যার মাধ্যমে আমরা দেশের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে পারব, স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে পারব এবং প্রতিটি মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকারের হাত ধরে শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বড় ভূমিকা পালন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন অগ্রযাত্রা।