ইয়েমেন সংঘাতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। হুতি বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় লড়াইরত সরকারি বাহিনীর সহায়তায় দেশটি নতুন করে অর্থায়ন করবে বলে একাধিক সূত্র ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব হুতিবিরোধী বাহিনীকে বিমান সহায়তা প্রদানের বিষয়েও সম্মতি জানিয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকদের এই উদ্যোগকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে যে মতপার্থক্য ছিল, বর্তমান এই সহযোগিতা সেই দূরত্ব কমারই ইঙ্গিত দেয়। হুতিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। উল্লেখ্য, এর আগে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিভিন্ন বাহিনী, বিশেষ করে ‘জায়ান্ট ব্রিগেড’-এর মতো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো আমিরাত থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেত। তবে গত জানুয়ারি মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত আকস্মিকভাবে ইয়েমেন থেকে নিজেদের সব সামরিক সম্পদ প্রত্যাহার ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়, যা এখন নতুন করে শুরু হতে যাচ্ছে। এসব হামলায় দেশটির বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন করে অর্থায়নের উদ্যোগ সেই অবস্থান থেকে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটির ভূমিকা হবে সৌদি আরবকে রক্ষা করা।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (এসটিসি) অঞ্চলটির স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য হলো ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান পৃথক রাষ্ট্রের সীমানা ফিরিয়ে আনা। তবে এখন পর্যন্ত সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত—কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এই গণভোটের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরব যদি এই গণভোটের প্রতি সমর্থন জানায়, তবে এসটিসি বাহিনীর ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ শিথিল করা হতে পারে। বর্তমানে এসটিসি বাহিনী সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে গিয়ে লড়াই করার অনুমতি পায় না।
এদিকে, এডেনভিত্তিক ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণকারী হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করলেও মারিব ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে তা খুব একটা সাফল্য পায়নি।
এসটিসি প্রধান আইদারুস আল-জুবাইদি বর্তমানে সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন। গত জানুয়ারিতে দুই বছরের মধ্যে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের ঘোষণা এবং দক্ষিণ ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার পর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। সে সময় এসটিসি বাহিনীর জন্য আমিরাতের পাঠানো অস্ত্রের একটি চালানে সৌদি আরব বিমান হামলা চালালে পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটে, যার জেরে জুবাইদি আবুধাবিতে পালিয়ে যান এবং তৎকালীন সৌদি-সমর্থিত সরকার তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার বিচার প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা নিয়ে আমিরাতের নীতিনির্ধারকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের লক্ষ্য এখন মারিব ও তাইজ শহর দখল করা, যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল-সিসি সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার জন্য পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন ডেকেছেন। সিসি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মিসর কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে জড়াবে না, বরং তাদের মূল লক্ষ্য হবে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা প্রদান করা। ইয়েমেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই নতুন সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।