বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর ঘরে আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাদেই সমাগত হতে যাচ্ছে পবিত্র হজ ও ঈদুল আজহা। এই সময়টা উৎসব ও গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের হলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের মনে বিন্দুমাত্র আনন্দ বা উল্লাস নেই।
দক্ষিণ গাজার একটি শরণার্থী তাবুতে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি নারী নাজিয়া আবু লেহিয়ার মনও ভীষণ ভারাক্রান্ত। এক বছর আগে ইসরায়েলি হামলায় তার স্বামী প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান অবরুদ্ধ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পবিত্র হজ পালনের কোনো সুযোগ না থাকায় গভীর আফসোস প্রকাশ করেছেন এই বয়োবৃদ্ধ নারী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এক বিশেষ প্রতিবেদনে গাজার এই করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের ভয়াবহ সামরিক হামলা শুরু হওয়ার আগে প্রতি বছর এই উপত্যকা থেকে অন্তত ৩ হাজার ফিলিস্তিনি মুসলমান সৌদি আরবে হজ পালন করতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। গত বছরের অক্টোবরে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মনে আবারও স্বাভাবিকভাবে হজ পালনের তীব্র আশা জেগে উঠেছিল। কিন্তু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের আন্তর্জাতিক চলাচলের ওপর এখনো অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। এর ফলে গাজাবাসীর হজে যাওয়ার সেই লালিত আশা এবারও সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুদ্ধবিরতির পর গাজা সীমান্তে অবস্থিত রাফা ক্রসিং আংশিক খুলে দেয় ইসরায়েল। তবে এই পথ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে মাত্র কয়েক শ গুরুতর অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার জন্য বিশেষ বিবেচনায় পারাপার হতে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ নাগরিক কিংবা হজে গমনেচ্ছুকদের জন্য এই সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ একেবারেই নেই বললেই চলে। ৬৪ বছর বয়সী নাজিয়া আবু লেহিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চারদিকের সীমান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ। আল্লাহর ঘরের হাজিদের সঙ্গে এমন আচরণ কেন করা হচ্ছে? এই পবিত্র ও বরকতময় দিনগুলোতে আমাদের তো মক্কা-মদিনায় থাকার কথা ছিল।’ হজ পালনের সুযোগ হারানোর পাশাপাশি গাজায় এবার উৎসবের অন্যতম প্রধান অংশ পশু কোরবানিরও কোনো সুযোগ নেই। গাজার স্থানীয় কৃষি মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও কঠোর অবরোধের কারণে টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানি ছাড়াই ঈদ পালন করতে যাচ্ছেন গাজার লাখ লাখ বাসিন্দা। দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানে উপত্যকাটির অভ্যন্তরীণ সমগ্র পশুসম্পদ খাতকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। অথচ যুদ্ধের আগে স্বাভাবিক সময়ে ঈদের এই মৌসুমে গাজায় প্রতিবছর গড়ে ৪০ থেকে ৬০ হাজার কোরবানির পশু আমদানি করা হতো, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এত বাধাবিপত্তি ও মানবেতর জীবনযাপনের মধ্যেও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও আশা হারাচ্ছেন না গাজার সাধারণ মুসলমানেরা। নাজিয়া আবু লেহিয়া নিজের আকুতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার কেবল এই একটাই ভয় হচ্ছে—হজ পালন করার এই তীব্র ব্যাকুলতা বুকেই নিয়ে আমি হয়তো আমার পরলোকগত স্বামীর মতোই একদিন হঠাৎ মারা যাব। তবে আল্লাহর ইচ্ছা থাকলে সমস্ত বাধা, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক অবরোধ সত্ত্বেও আমি শেষ দিন পর্যন্ত পবিত্র হজ পালনের আশা মনে বাঁচিয়ে রাখব।’