গোয়ার বিলাসবহুল রিসোর্টে সুইমিংপুলের নীল জলের ধারে যখন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের ডিফেন্ডার শামসুন্নাহার সিনিয়র এবং ফরোয়ার্ড সুরভী আকন্দ প্রীতি এসে বসলেন, তাঁদের চোখেমুখে মালদ্বীপকে ৪-২ গোলে হারানোর স্বস্তির চেয়েও বেশি কাজ করছিল ৩১ মে ভারত ম্যাচের ‘অগ্নিপরীক্ষা’র তাড়না।
মাঠের অনুশীলনে আজ ছুটি ছিল, শরীরকে সতেজ করার ‘রিকভারি সেশন’ রাখেন কোচ। এরই ফাঁকে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন এই দুই নারী ফুটবলার।
মালদ্বীপের বিপক্ষে ১১ সেকেন্ডে গোল পেলেও ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের রক্ষণে যে ফাটল দেখা দিয়েছিল, তা নিয়ে রাখঢাক করলেন না শামসুন্নাহার। ৪–২ গোলের ব্যবধানে জিতলেও বাংলাদেশ যে খেলায় খুব একটা এগিয়ে ছিল না, সেটিই ফুটে উঠল তাঁর কথায়, ‘মালদ্বীপ ম্যাচে তিন পয়েন্ট যে পেয়েছি, এটাই আমাদের জন্য ভালো। একজন খেলোয়াড় হিসেবে বলি, কালকে যেমন দেখেছেন আমাদের রক্ষণে সমস্যা ছিল। প্রথম গোলটা যেটা হয়েছে, ডিফেন্স লাইনের কমপ্যাক্টনেসটা (দৃঢ়তা) ধরে রাখতে পারলে সমস্যাটা হতো না।’
প্রতি আক্রমণে খাওয়া দ্বিতীয় গোলটি নিয়ে শামসুন্নাহারের স্পষ্ট কথা, ‘রক্ষণে ভুল ছিল। এ নিয়ে স্যাররা (কোচ) কথা বলবেন, কাল কাজ করবেন। গোলটা কাউন্টারে হয়েছে, ওটাও সমস্যা হয়েছে। এটা নিয়ে কাজ হবে।’
তবে ম্যাচের শুরুতেই মাত্র ১১ সেকেন্ডে গোল পাওয়ার পর দল কি কিছুটা গা ভাসিয়ে দিয়েছিল? অতি আত্মবিশ্বাসের অনুযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা স্বাভাবিক খেলছি। অতি আত্মবিশ্বাসের কিছু নেই। মন খারাপেরও কিছু নেই। প্রথম ম্যাচটা জিতেছি। দুটি গোল খেয়েছি, গোল হতেই পারে।’

আজ গোয়া সমুদ্র সৈকতে রিকভারি সেশন করেছে বাংলাদেশ
মালদ্বীপের জালে ভারত যেখানে ১১ গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ চার গোল দিলেও সুযোগ নষ্ট করেছে ভূরি ভূরি। এ নিয়ে শামসুন্নাহারের বিশ্লেষণ, ‘আসলে ভারত অনেক গোল দিয়েছে মালদ্বীপকে। আমরাও সুযোগ পেয়েছি, আপনারাই দেখেছেন। যেমন ঋতুপর্ণা অনেকগুলো ক্রস করেছে, ঠিকঠাক হলে গোল হতে পারত। আমার মনে হয় ভারতের চেয়ে আমরা বেশি সুযোগ পেয়েছি, কিন্তু কাজে লাগাতে পারিনি। কালকে আমি আর কোহাতি উঠে উঠে খেলেছি। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমরা এতটা উঠতে পারব না। কারণ, আমরা চাপে থাকব। তবে ভারতও চাপে থাকবে।’
৩১ মে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটিই নির্ধারণ করবে গ্রুপ–সেরা কে হচ্ছে। ড্র করলেই ভারত চলে যাবে সুবিধাজনক অবস্থানে, সেমিতে এড়াতে পারবে শক্তিশালী নেপালকে। কিন্তু বাংলাদেশ দল হিসাবের খাতা নিয়ে নামতে নারাজ। শামসুন্নাহার সিনিয়রের সোজাসাপটা কথা, ‘ভারতের সঙ্গে আগেও খেলেছি, এবারও খেলব। অবশ্যই তারা শক্তিশালী টিম। আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে খেলার চেষ্টা করব। চাপের কিছু নেই, ৫০-৫০ খেলা হবে। যারা সুযোগ পাবে, তারা সেটা কাজে লাগাতে চাইবে।’
ভারতকে রুখতে রণকৌশল কেমন হবে, তারও একটা আভাস দিয়ে রাখলেন এই ডিফেন্ডার, ‘আমরা জিততে চাই। ভারত বেশির ভাগ উইং দিয়ে খেলে। আমরা চাইব যে উইং ব্লক করতে, তাতে ওদের স্ট্রাইকাররা বল রিচ করতে (নাগাল পেতে) পারবে না। চেষ্টা করব উইং ব্লক করার। ভারতের সঙ্গে জিতলে দেশবাসীসহ সবার মধ্যে একটা আলাদা ভালো লাগা কাজ করে। আমরা সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করব, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।’
মালদ্বীপ ম্যাচে বদলি নেমে ২-২ থেকে ৩-২ করে দলকে স্বস্তি দেওয়া স্ট্রাইকার সুরভী আকন্দ প্রীতিও ভারতের বিপক্ষে মহারণের আগে দারুণ রোমাঞ্চিত। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে নামার আগে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে খেলা মানে আমাদের অতিরিক্ত একটা শক্তি আসে। ওদের সঙ্গে খেলায় আমরা ভালো করি সব সময়। আর পাশের দেশ, শক্তি পাই। তিন পয়েন্ট পেলে খুশি হব।’
বাংলাদেশ দলের আক্রমণভাগ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রীতির মূল্যায়ন, ‘বাংলাদেশ আরও ভালো করতে পারে। মালদ্বীপ ম্যাচে তিন পয়েন্ট নিতে পেরেছি। তবে ভারতের উইঙ্গাররা ভালো। আমাদের লেফট ব্যাক, রাইট ব্যাক ওদের পাহারায় রাখবে।’
ফরোয়ার্ড লাইন কি দলের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রীতি বলেন, ‘কোচ যাদের ভালো মনে করেন, তাদের একাদশে রাখেন। পরে যারা নামেন, আমরা চেষ্টা করি।’

সাংবাদিকদের মুখোমুখি সুরভী আকন্দ প্রীতি
ভারতের শক্তিশালী মাঝমাঠ নিয়ে বাংলাদেশ শিবির কিছুটা চিন্তিত হলেও মনিকা চাকমা ও মারিয়া মান্ডার ওপর অগাধ আস্থা দুই ফুটবলারেরই। শামসুন্নাহার সিনিয়র বলেন, ‘মনিকা মালদ্বীপ ম্যাচ খেলেনি। ভারত ম্যাচ সে আর মারিয়া জুটি গড়ে খেললে ভারতের সঙ্গে সমস্যা হবে না।’
একই সুরে সুর মিলিয়ে প্রীতির কথা, ‘ওদের মাঝমাঠ অনেক স্ট্রং।’
গোয়ার সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই ভারত ম্যাচের আগে খানিক উত্তাল বাংলাদেশ শিবির। তবে মনিকা-মারিয়াদের প্রত্যাবর্তনে মাঝমাঠের শক্তি বাড়িয়ে, উইং ব্লক করার নিপুণ ছক কষে ভারতের শক্তিশালী দুর্গ ভাঙতে পুরোপুরি প্রস্তুত বাংলাদেশ দল। উত্তর মিলবে আগামী পরশু রোববার।