বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৪১ বছর বয়সে এসেও নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ২০২৬ সালের আসন্ন আসরে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড। বয়স চল্লিশের কোঠা পার হলেও মাঠের পারফরম্যান্স বা ফিটনেসে এখনও বিন্দুমাত্র মরচে পড়েনি তার। বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে নিয়মিত আলো ছড়াচ্ছেন এবং ফুটবলকে বিদায় বলার মতো কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি।
এমন পরিস্থিতিতে ফুটবলপ্রেমীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—তাহলে কি ২০৩০ সালের বিশ্বকাপেও দেখা যাবে সিআরসেভেনকে? এবার সেই কৌতূহল ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিলেন পর্তুগাল জাতীয় দলের স্প্যানিশ কোচ রবার্তো মার্টিনেজ।
সম্প্রতি স্প্যানিশ রেডিও স্টেশন ‘কাদেনা সের’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রবার্তো মার্টিনেজের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, রোনালদো ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে খেলতে পারেন কি না। জবাবে পর্তুগিজ কোচ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে রোনালদোর খেলার সম্ভাবনা নিয়ে কারও মনে কোনো ধরনের সন্দেহ থাকা উচিত নয়। কারণ, সে নিজের কঠোর পরিশ্রম ও যোগ্যতাবলেই আজ এই অনন্য স্থানটি অর্জন করে নিয়েছে।
রোনালদোর এই দীর্ঘ পথচলা এবং তরুণদের ওপর তার প্রভাব নিয়ে কোচ আরও যোগ করেন, পর্তুগালের সমস্ত উদীয়মান ও তরুণ ফুটবলারদের মাঝে তারা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এই লড়াকু আদর্শ ছড়িয়ে দিতে চান। কেননা, নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য রোনালদো সবসময়ই এক চমৎকার ও নিখুঁত রোল মডেল হিসেবে ভূমিকা রাখছেন।
পর্তুগিজ মহাতারকার প্রতি নিজের গভীর মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গিয়ে কোচ মার্টিনেজ তাদের ভেতরের কিছু কৌশলগত পর্যালোচনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, জাতীয় দলের কোচিং স্টাফরা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে একটি চমৎকার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন; আর তা হলো—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কেবল নির্দিষ্ট কোনো দলীয় ট্রফি বা ব্যক্তিগত কোনো পুরস্কার জেতার জন্য মাঠে নামেন না।
রোনালদো আসলে কী খাচ্ছেন বা কেমন জীবনযাপন করছেন, তা দিয়ে তাকে পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়; বরং তার ভেতরের ফুটবলকে জয়ের যে তীব্র ক্ষুধা রয়েছে, তা দিয়েই মূলত তাকে চেনা যায়। ক্রিস্টিয়ানো ক্যারিয়ারে যা-ই জিতুক না কেন, ঠিক তার পরের দিনই নিজেকে আরও উন্নত ও ছাড়িয়ে যাওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে দেখা যায়, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
বিশ্বের অনেক নামী ফুটবলারের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে একটি তুলনামূলক চিত্র টেনে মার্টিনেজ বলেন, তিনি তার কোচিং ক্যারিয়ারে এমন অনেক বড় মাপের খেলোয়াড়ের সান্নিধ্য পেয়েছেন, যারা ক্যারিয়ারে মাত্র একবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ব্যালন ডি’অর জেতার পরের দিনই ফুটবলার হিসেবে নিজেদের ভেতরের সেই জয়ের ক্ষুধা বা তীব্র তাগিদ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু রোনালদোর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ফুটবল মাঠে আমরা রোনালদোর মধ্যে যা দেখছি, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও এক অনন্য মানসিকতার জীবন্ত উদাহরণ।
পর্তুগাল কোচের মতে, ফুটবলের প্রতি এই অটুট লক্ষ্য ও একাগ্রতা ধরে রাখতে পারাই রোনালদোর এত দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারের মূল চাবিকাঠি। অবশ্য এর পেছনে তার জিনগত কিছু ইতিবাচক বিষয় যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে তার অবিরাম কঠোর পরিশ্রম—যা তার শরীরকে যেকোনো তরুণ ফুটবলারের মতো ফিট রাখতে সাহায্য করে। আর এই সবকিছুর পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে তার ইস্পাতকঠিন প্রবল মানসিকতা।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটেছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। এরপর থেকে দেশের জার্সিতে এখন পর্যন্ত রেকর্ড ২২৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন তিনি, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে যেকোনো দেশের নাগরিকের জন্য সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। শুধু ম্যাচ খেলাই নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪৩টি গোল করার বিশ্বরেকর্ডও এখন এই পর্তুগিজ মহাতারকার দখলে। এর পাশাপাশি বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ফুটবল বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য এক কীর্তি ও গৌরব রয়েছে তার নামের পাশে।