ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের বিশ্বেশ্বরী দেবী রোড থেকে একটি রাস্তা বুড়া পীরের মাজারের বিপরীত দিকে চলে গেছে। সেটির নাম গোবিন্দ গাঙ্গুলী রোড। এ পথেই গত ৮ মে একটি বাড়ির আঙিনায় দেখা মিলল কারিপাতাগাছের। দেখতে অনেকটা নিমগাছের মতো হলেও এর পাতা সামান্য কচলে নাকের কাছে নিতেই পাওয়া গেল গোলমরিচ, লবঙ্গ ও আদার মিশ্রিত এক চমৎকার ঘ্রাণ। এ সুবাসই নিশ্চিত করল যে এটি কারিপাতা। এর পরদিন ৯ মে ময়মনসিংহে আমার বাসার টবে ফুটে থাকা কারিপাতা ফুলের ছবি তোলার সুযোগ হলো।
কারিপাতা আমাদের দেশে অনেকের কাছে আজও অনেকটা অচেনা। তবে দক্ষিণ ভারতে এর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। ২০১২ সালে কেরলম ভ্রমণে গিয়ে দেখেছি, সেখানে সবজি, ডাল, পোলাও, মাংস, চানাচুর—এমনকি কলার চিপসেও কারিপাতা অপরিহার্য উপাদান। আমাদের দেশে এটি কোথাও কোথাও ‘নিমভুত’ বা ‘বারসুঙ্গা’ নামে পরিচিত। গত বছর নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া গ্রামে সোমেশ্বরী নদীর ধারেও এই উদ্ভিদকে বুনো পরিবেশে জন্মাতে দেখেছি।
কারিপাতার বৈজ্ঞানিক নাম Bergera koenigii, এটি Rutaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যে পরিবারের সদস্য আমাদের পরিচিত কামিনী ও লেবুগাছ। ইংরেজিতে একে কারি ট্রি বা সুইট নিম বলা হয়। এর আদিনিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশ।
কারিপাতার গাছ ৫-৬ মিটার উঁচু হতে পারে। এর পাতা দেখতে অনেকটা নিমপাতার মতো, তাই একে অনেক সময় ‘মিষ্টি নিম’ বলা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০০ মিটার উঁচুতেও কারিপাতাগাছ জন্মাতে পারে। পাতায় সালফারঘটিত একধরনের উদ্বায়ী তেল থাকার কারণে সুন্দর ঝাঁজালো গন্ধ আছে। এই সুগন্ধির জন্যই কারিপাতা রান্নায় মসলাপাতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পত্রবিন্যাস খুব সুন্দর। পাতা পক্ষল ও যৌগিক, নিমপাতার মতোই পাতাগুলো ডালের মাথা থেকে চারদিকে সূর্যরশ্মির মতো ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিটি পাতায় অনুপত্রকের সংখ্যা ৯-১৫। অনুপত্রকের কিনারা খাঁজকাটা, অগ্রভাগ সুচালো। ডালের মাথায় পুষ্পমঞ্জরিতে সাদা রঙের ফুল ফোটে, ফুলে সুগন্ধ আছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ফুল ফোটে। ফল ডিম্বাকার থেকে গোলাকার, কাঁচা ফলের রং সবুজ। ফল পরিপক্ব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লালচে থেকে কালো বর্ণের হয়ে যায়। বীজ থেকে সহজে চারা তৈরি করা যায়।
কারিপাতা কেবল স্বাদ বা সুগন্ধ বাড়ায় না, এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর। এতে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও আয়রন। মাংস, ডাল কিংবা মিশ্র সবজিতে কয়েকটি কাঁচা পাতা ছিঁড়ে দিলে রান্নায় সুবাস আসে। দক্ষিণ ভারতীয় খাবার যেমন বড়া, রাসাম বা কাধিতে এটি অনন্য।
আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে কারিপাতা শক্তিশালী ঔষধি উদ্ভিদ। এর পাতা, মূল ও ছাল—সবই উপকারী। পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে ‘কারি পাউডার’ হিসেবে অনেক দিন সংরক্ষণ করা যায়। তবে কাঁচা পাতায় ঘ্রাণ ও গুণ সবচেয়ে বেশি থাকে। কম্বোডিয়ায় এই পাতা আগুনে সেঁকে টক স্যুপে ব্যবহার করা হয়। এমনকি ধর্মীয় আচারে তুলসীপাতার বিকল্প হিসেবেও এর ব্যবহার দেখা যায়।
পেটের সমস্যা, আমাশয় ও ডায়রিয়ার চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের পাতা ব্যবহৃত হয়। কাঁচা পাতা চিবিয়ে খেলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। পাতার ক্বাথ তৈরি করে খেলে বমিভাব কেটে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কারিপাতা সেবনে বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোনো বিষাক্ত পোকা কামড়ালে কাঁচা পাতা বেটে প্রলেপ দিলে জ্বালাপোড়া ও বিষ উপশম হয়। যকৃৎ বা লিভারের ব্যথা সারাতে এর শিকড়ের রস কার্যকর।
বুনো পরিবেশে অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই উদ্ভিদের সঠিক ব্যবহার ও চাষাবাদ আমাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্য নতুন দিকে উন্মোচন করতে পারে।