নোয়াখালীর কবিরহাট সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ ও সহকারী অধ্যাপক নুরুল হক মিলনের মধ্যে সংঘটিত হাতাহাতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) সকালে প্রায় ৩ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৯ এপ্রিল দুপুরে কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষক মিলনায়তনে অধ্যক্ষের জন্য নির্ধারিত আসনে বসে আছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মামুনুর রশীদ। তার পাশে সহকারী অধ্যাপক নুরুল হক মিলন এবং শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ সময় একপর্যায়ে অধ্যক্ষ ও সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অধ্যক্ষ নিজের আসন থেকে উঠে গিয়ে সহকারী অধ্যাপক মিলনকে থাপ্পড় মারেন এবং দাঁত ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন বলে ভিডিওতে দেখা যায়। এরপর উভয়ের মধ্যে কিল-ঘুষি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম এবং জীববিজ্ঞানের প্রভাষক ওসমান গনি এগিয়ে এসে দুজনকে পৃথক করেন। পানির ফিল্টার নিয়ে বিরোধ থেকেই সংঘর্ষ শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম জানান, গত ২ মার্চ কলেজের শিক্ষক ডরমিটরির পানির ফিল্টার নষ্ট হয়ে যায়।
বিষয়টি একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে ৯ এপ্রিল বিষয়টি আবারও উত্থাপন করা হলে অধ্যক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে সহকারী অধ্যাপক নুরুল হক মিলনকে উদ্দেশ করে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এর প্রতিবাদ জানালে অধ্যক্ষ প্রথমে তার গায়ে হাত তোলেন এবং পরে উভয়ের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে।
একই অভিযোগ করেন সহকারী অধ্যাপক নুরুল হক মিলন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ডরমিটরির পানির ফিল্টার অচল ছিল। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে অধ্যক্ষ তাদের মোটরের পানি পান করার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে তিনি চেয়ার থেকে উঠে এসে তার ওপর হামলা চালান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে মামুনুর রশীদ এককভাবে কলেজ পরিচালনার চেষ্টা করছেন। কলেজের আর্থিক কর্মকাণ্ডে কাউকে সম্পৃক্ত করতে চান না এবং শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, কলেজের ১৭ থেকে ১৮ জন মাস্টাররোলভুক্ত কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে বেতন সংক্রান্ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ এনে গত ১১ মে কলেজের ১১ জন শিক্ষক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৯ জুন নোয়াখালী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ বলেন, “যে শিক্ষকের সঙ্গে আমার মারামারি হয়েছে, তিনি কি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন? অভিযোগ না করলে আপনারা এত আগ্রহ দেখাচ্ছেন কেন? এতে তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নিতে চাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, কলেজের তহবিল সংকটের কারণে মাস্টাররোলভুক্ত কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে।
একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে দুই শিক্ষকের মধ্যে প্রকাশ্যে হাতাহাতির ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষকদের এমন আচরণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।