বগুড়ার কামারপল্লিগুলোতে চলছে ব্যাপক কর্মব্যস্ততা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের ভাটিতে লোহা পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে দা, চাকু, বঁটি, চাপাতি ও ছুরিসহ কোরবানির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এখন কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কামাররা। শহরের সাবগ্রাম, নারুলী, মালগ্রাম, বকশিবাজার, কলোনি ও গালাপট্টি এলাকার কামারপল্লিগুলো ঘুরে দেখা গেছে, টং টং হাতুড়ির শব্দে মুখর পুরো এলাকা। কেউ আগুনে লোহা গরম করছেন, কেউ হাতুড়ি দিয়ে ধারালো আকৃতি দিচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের শান দিতে। ঈদের আগে দম ফেলারও যেন সময় নেই তাদের। কামাররা জানান, কোরবানির ঈদকে ঘিরেই তাদের বছরের সবচেয়ে বড় ব্যবসা হয়। ঈদের অন্তত এক মাস আগে থেকেই অর্ডার আসতে শুরু করে। এবারও দা, চাকু, চাপাতি ও বঁটির চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে বড় গরু জবাইয়ের জন্য ভারী দা ও ধারালো চাকুর চাহিদা বেশি। জেলা কামার শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বগুড়ার সাতমাথা, মালতিনগর, কলোনি, চকসূত্রাপুর, শেরপুর রোড, দুপচাঁচিয়া, শাজাহানপুর, নন্দীগ্রাম ও শিবগঞ্জ মিলিয়ে বর্তমানে ৩৫০-৪০০ কামার পরিবার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বছরের অন্য সময় কৃষি যন্ত্রপাতি ও সাধারণ লোহার কাজ করলেও ঈদের আগের প্রায় এক মাস পুরোপুরি কোরবানির সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন তারা।

বকশিবাজার এলাকার কারিগর শ্যামল চন্দ্র মোহন্ত কর্মকার জানান, তিনি ৫২ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। বাবার কাছ থেকেই কাজ শিখেছেন। এবার কাজের চাপ যেমন বেশি, তেমনি দামও কিছুটা বেড়েছে। কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তার দোকানে বঁটি ৫০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০, দা ৮০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা এবং চাকু ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় প্রতিটি পণ্যে ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। শ্যামল চন্দ্র আরও বলেন, আগে যেখানে কয়লার বস্তা ৩০০-৪০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায়। লোহা ও কারিগরদের মজুরিও বেড়েছে। শান দিতে কাজভেদে ৫০-১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তার দোকানে চাকু বানাতে আসা হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দাম একটু বেশি হলেও কাজ ভালো। ছোট-বড় মিলিয়ে দুটি চাকু বানাতে এক হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে।’ সাবগ্রামের ভাই ভাই মহন্ত কর্মকারের দোকানের মালিক গজেন চন্দ্র মহন্ত জানান, চাপাতির দাম প্রতি পিস ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। গরু জবাইয়ের ছুরি এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা এবং মাংস কাটার ছুরি ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্প্রিংয়ের বঁটি প্রতিকেজি ১০০ টাকা ও কাঁচা লোহার বঁটি ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, গতবারের তুলনায় এবার বেচাকেনা ভালো। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, চাপও বাড়ছে। অনলাইনে বিক্রি বাড়লেও দেশীয় হাতে তৈরি পণ্যের চাহিদা এখনো অনেক। ক্রেতা সনি জানান, তিনি ৭১ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির গরু কিনেছেন। কাটাকাটির জন্য পুরোনো দা ধার দিতে এসে ১৫০ টাকা খরচ হয়েছে। তার মতে, গতবছরের তুলনায় এবার দাম কিছুটা বেশি হলেও প্রয়োজনের কারণে কিনতেই হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাঁশের হাতলযুক্ত লোহার চাকু ৫০ থেকে ১২০ টাকা এবং বিভিন্ন মানের বঁটি ১৫০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

১ নম্বর রেল ঘুমটি এলাকার ব্যবসায়ী অমল দে জানান, মাংস কাটার চাপাতি আকারভেদে ৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি গরু জবাইয়ের বড় ছুরি ৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তার দোকানে প্যাকেটজাত চাকু ১০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া গেলেও ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি খোলা চাকুর প্রতি। তিনি বলেন, ‘এবার বিক্রি ভালো। শেষ মুহূর্তে ক্রেতার চাপ আরও বেড়েছে। মানুষ এখন ভালো মানের জিনিস কিনতে চায়।’ ক্রেতারা বলছেন, কোরবানির সময় ভালো মানের ধারালো সরঞ্জাম না হলে পশু জবাই ও মাংস কাটতে সমস্যা হয়। তাই অনেকেই আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে রাখছেন। শহরের গালাপট্টি প্রবেশমুখে আরিফ স্টোরের স্বত্বাধিকারী আরিফ বলেন, ‘আগে ঝাউতলা রেললাইনের পাশে দোকান ছিল। পরে গালাপট্টিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার বেচাকেনা অনেক ভালো। দেশি পণ্যের চাহিদাই বেশি।’ তার দোকানে চাপাতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, দা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, বঁটি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং দেশি কুড়াল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চামড়া ছাড়ানোর ছোট ব্লেডের ছুরি পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। ক্রেতা হান্নান বলেন, ‘গরুর চামড়া ছাড়ানোর জন্য ৩০ টাকায় একটি চাকু কিনেছি। দাম স্বাভাবিকই মনে হয়েছে।’ অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অনলাইন বাজারেও বাড়ছে কসাই সরঞ্জামের বেচাকেনা। ‘কোরবানি নাইফ সেট’, ‘প্রিমিয়াম কসাই চাপাতি’ কিংবা ‘জাপানি স্টিল ছুরি’ নামে বিভিন্ন ফেসবুক পেজে চলছে বেচাকেনা। কয়েকজন বিক্রেতা জানান, তারা প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি পর্যন্ত অর্ডার পাচ্ছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় কুরিয়ারে পণ্য পাঠানো হচ্ছে। বগুড়ার অনলাইন বিক্রেতা মাহিন হোসেন বলেন, আগে মানুষ বাজারে এসে কিনতো। এখন ভিডিও দেখে অর্ডার দেয়। ভালো ছবি ও ভিডিও দিলে দ্রুত বিক্রি হয়।