মঙ্গলবার আরাফাতের পবিত্র ময়দানে সমবেত লাখো মুসলিমের উদ্দেশ্যে হজের এই বিশেষ খুতবা প্রদান করেন মসজিদে নববীর সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। খুতবা চলাকালীন তিনি উল্লেখ করেন, এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহর কিছু চিরন্তন ও অমোঘ নিয়ম রয়েছে, যার কোনো পরিবর্তন বা ব্যতিক্রম ঘটে না। একজন প্রকৃত মুমিনের মূল দায়িত্ব হলো আল্লাহর এই নিয়মগুলোর ওপর অবিচল বিশ্বাস রাখা এবং অতীতের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হজ থেকে বিশেষ উদ্ধৃতি দিয়ে শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি বলেন, আল্লাহ তাআলা সর্বদা সত্যিকারের বিশ্বাসী ও মুমিন বান্দাদের রক্ষা করেন। যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং চরম অকৃতজ্ঞ, তাদের তিনি মোটেও পছন্দ করেন না। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, অতীতে অনেক জালিম জনপদকে তিনি সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা যখন নিজেদের জুলুম ও পাপাচার চালিয়েই যাচ্ছিল, তখন তাদের ওপর কঠোর শাস্তি আপতিত হয়েছিল। আর চূড়ান্তভাবে প্রত্যেক সৃষ্টিকে একদিন তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করে, আল্লাহও তাকে সাহায্য করেন; কারণ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও পরাক্রমশালী।
হজের এই পুণ্যময় খুতবায় বিশ্ব মুসলিমের সার্বিক কল্যাণ ও শান্তি কামনায় আল্লাহর দরবারে প্রাণভরে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। খতিব দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি সারাবিশ্বের মুসলমানদের অবস্থার উন্নতি করে দিন। তাদের সবাইকে সত্যের পথে ঐক্যবদ্ধ করুন। তাদের ইহকালীন দ্বীনি জীবন এবং পরকালীন দুনিয়াবি জীবনকে সুন্দর ও বরকতময় করে দিন।’
ইসলামিক ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে সৌদির বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের জন্যও খুতবায় বিশেষভাবে দোয়া করা হয়। আল্লাহর পবিত্র ঘরে আসা হাজিদের ইবাদত-বন্দেগি সহজতর করার জন্য এবং দুই পবিত্র মসজিদের (মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী) খিদমতে উদার হস্তে অর্থ ব্যয় ও সেবা নিশ্চিত করায় তাদের প্রশংসা করা হয়। মহান আল্লাহ যেন তাদের ইহকাল ও পরকালে এর উত্তম প্রতিদান দান করেন, সেই প্রার্থনা করা হয়। এর পাশাপাশি পবিত্র মাঠে উপস্থিত হাজিদের জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়, যেন আল্লাহ তাদের কষ্টলব্ধ হজ কবুল করেন, জীবনের সমস্ত গুনাহ খাতা মাফ করে দেন এবং সুস্থ ও নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার তওফিক দান করেন।
হজের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, সেদিন সূর্যোদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত লাখো হাজি আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তারা অত্যন্ত মনোযোগের সাথে হজের খুতবা শ্রবণ করেন এবং একই সাথে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন। ইসলামিক বিধান অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ৯ তারিখে এই আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাটাই হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান ফরজ অংশ।
বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান সেদিন সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে একসাথে এই পবিত্র মাঠে সমবেত হয়েছিলেন। সেই সময় সমবেত সবার মুখে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল একটাই অভিন্ন ধ্বনি—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয় মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’ অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ, আমি হাজির। আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, নিয়ামত এবং সাম্রাজ্য একমাত্র তোমারই, তোমার কোনো শরিক নেই।’ লাখো কণ্ঠের এই ব্যাকুল তালবিয়ার ধ্বনিতে সেদিন কেঁপে উঠেছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায় হজের স্মৃতিবিজড়িত সেই ঐতিহাসিক প্রান্তর।
পবিত্র খুতবায় একজন মুমিনের আসল পরিচয় ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করা, ভাগ্যের ভালো-মন্দের (তাকদির) ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা এবং যেকোনো কঠিন বিপদে ধৈর্য ধারণ করার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি উপস্থিত মানবজাতিকে কেয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে খুতবায় বলা হয়, মহান আল্লাহই একমাত্র চিরন্তন সত্য। তিনিই একদিন সমস্ত মৃত জীবকে পুনরায় জীবিত করে হাশরের মাঠে একত্রিত করবেন এবং কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, এতে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই।
হজের বিশ্বজনীন ও মানবিক দিকটি তুলে ধরে খতিব বলেন, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন বর্ণের এবং ভিন্ন দেশের মানুষ এখানে এসে নিজেদের সব ধরনের সামাজিক ও ভৌগোলিক পার্থক্য ভুলে গিয়ে এক কাতারে শামিল হয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন। এই অনন্য বৈশ্বিক ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ আর পারস্পরিক সহমর্মিতাই হলো হজের অন্যতম বৃহৎ ও প্রধান শিক্ষা। হজের এই বিশেষ দিন ও সময়গুলোতে হাজিদের বেশি বেশি ইবাদত ও দোয়া করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এই পবিত্র স্থানগুলো হলো মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ স্থান। আল্লাহ নিজেই পবিত্র কোরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’
উল্লেখ্য, ইসলামের প্রধান পাঁচটি স্তম্ভ বা ভিত্তির মধ্যে হজ হলো অন্যতম এবং পঞ্চম স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য। কাবাঘর তাওয়াফ করা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ করা, মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করার মতো হজের প্রতিটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পেছনে রয়েছে ইসলামের আদি পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান ত্যাগ, গভীর আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক পটভূমি।