কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার কেবলকৃষ্ণ জুম্মাহাটের বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের বাড়িতে পা রাখলেই যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। তাঁর বাড়ির একটি টিনের ঘরে গড়ে তোলা ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় সারি সারি সাজানো রয়েছে পুরোনো দিনের স্মৃতিচিহ্ন। এখানে রয়েছে ২২টি গ্রামোফোন বা কলের গান, যার প্রতিটিই এখনো সচল। এর মধ্যে আটটি দুষ্প্রাপ্য হাতে ঘোরানো গ্রামোফোন এবং ১৪টি ইলেকট্রিক রেকর্ড প্লেয়ার রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫ হাজার গানের রেকর্ড—যার মধ্যে ৩ হাজার ইপি (ছোট ডিস্ক) ও ২ হাজার এলপি (বড় রেকর্ড)—এবং প্রায় এক হাজার অডিও ক্যাসেট নিয়ে সাজানো এই বিশাল সংগ্রহশালা।
আমজাদ হোসেনের এই সংগ্রহের নেশার শুরুটা হয়েছিল কয়েক দশক আগে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর বাবা দেলওয়ার হোসেন ‘জনতা মাইক সার্ভিস’ নামে মাইকের ব্যবসা শুরু করেন। কিশোর বয়সে বাবার ব্যবসার সুবাদে মাইক চালাতে গিয়েই গ্রামোফোনের সঙ্গে আমজাদের পরিচয় ঘটে। সেই পরিচয় থেকে জন্ম নেওয়া ভালোবাসা পরবর্তীতে নেশায় রূপ নেয়। যেখানেই পুরোনো গানের রেকর্ডের খবর পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। এমনকি আব্বাসউদ্দীন আহমদের একটি গানের রেকর্ডের জন্য তিনি পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছেন।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেসামরিক বিভাগে চাকরি পাওয়ার পরও তাঁর এই সংগ্রহের নেশা কমেনি। চাকরির সুবাদে ঢাকার পুরান ঢাকা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি পুরোনো গ্রামোফোন ও রেকর্ড সংগ্রহ করেছেন। বেতনের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় করেছেন এই শখের পেছনে। ১৯৯১ সালে তিনি মিরপুরের কালুবাড়ি-বাউনিয়া এলাকায় ‘জনতা অডিও-ভিডিও সেন্টার’ নামে একটি দোকানও দিয়েছিলেন, যেখানে গানের রেকর্ড ও ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া দেওয়া হতো।
তবে এই শখের কারণে পারিবারিক জীবনে টানাপোড়েনও তৈরি হয়েছে। আমজাদের স্ত্রী মোছলেমা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘সবাই চাকরি করে টাকা সঞ্চয় করেছে, আর আমার স্বামী শুধু ক্যাসেট আর রেকর্ড সংগ্রহ করেছে। তার কোনো সঞ্চয় নেই। এখন আমি অসুস্থ, অথচ চিকিৎসা করানোর টাকা নেই। গ্রামোফোনের জন্য লোকটা এত ত্যাগ করল, কিন্তু সেগুলো রাখার মতো তাকও আমাদের ঘরে নেই। অযত্নে সব নষ্ট হচ্ছে, বিক্রি করতে বললেও সে রাজি হয় না।’
আমজাদের সংগ্রহে থাকা রেকর্ডগুলোর মধ্যে উত্তরবঙ্গের পুরোনো ভাওয়াইয়া গানের পাশাপাশি আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীম, কিশোর কুমার, আশা ভোসলে, পঙ্কজ উদাস, মোহাম্মদ রফি ও রুনা লায়লার মতো শিল্পীদের গান রয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা গান ও তাঁর ভাষণের তিনটি দুর্লভ রেকর্ডও তাঁর সংগ্রহে আছে। ২০২৪ সালে রেকর্ডগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তিনি সেগুলো পলিথিনে মুড়িয়ে মাটিতে পুঁতে রেখেছিলেন, পরে তুলে নতুন মোড়ক তৈরি করে সংরক্ষণ করেন।
২০১৭ সালের ৫ জুলাই অবসরের পর আমজাদ গ্রামে ফিরে আসেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিদিনের কাজের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে গ্রামোফোনগুলো পরিষ্কার করা। তিনি বাজার থেকে মশার কয়েলের খালি প্যাকেট সংগ্রহ করে তা দিয়ে খাপ বানিয়ে শিল্পী ও অ্যালবামের নাম লিখে রেকর্ডগুলো গুছিয়ে রাখেন। তবে টিনের ঘরে পর্যাপ্ত জায়গা ও সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে তিনটি কক্ষে ছড়িয়ে থাকা এই অমূল্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রযুক্তির বিবর্তনে এখন মুঠোফোনেই লাখ লাখ গান শোনা যায়, কিন্তু আমজাদের সংগ্রহে থাকা অনেক রেকর্ডই এখন আর কোথাও সহজে পাওয়া যায় না। টিনের ঘরের অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে এসব রেকর্ড কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে আমজাদ বেশ চিন্তিত। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকেরা আসেন, ভিডিও করে নিয়ে যান। কিন্তু জায়গার অভাবে এবং ভালো তাক না থাকায় এই সংগ্রহশালা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি সংরক্ষণে সরকার বা কোনো সংস্থা এগিয়ে আসে না। আমি মারা গেলে এসব কে দেখবে?’ প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোনোটির সঙ্গে বড় চোঙ, কোনোটির পাশে হাতল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একটু পর একটি রেকর্ড গ্রামোফোনে বসিয়ে হাতল ঘুরিয়ে দেন আমজাদ হোসেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেসে আসে পুরোনো দিনের গান—‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করবও কী…।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোন রেকর্ডটি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন, কোন শিল্পীর কণ্ঠে কোন গান আছে, কোন গ্রামোফোনের কোন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছিল, কীভাবে সেটি আবার সচল করেছেন—বলতে বলতে ফিরে যান কয়েক দশক আগের দিনগুলোতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব গ্রামোফোন এখন আমজাদের কাছে শুধু গান শোনার যন্ত্র নয়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উনিশ শতকের শেষ দিকে গ্রামোফোন তৈরি হওয়ার পর বিশ শতকের বড় একটি সময়জুড়ে এটি ছিল গান শোনার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। চাকরির আরও তথ্য: চাকরির বেতনের বড় একটি অংশও খরচ করতেন এসব কিনতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর সংগ্রহে গান ছাড়াও ইতিহাসের নানা দলিল রয়েছে।