নাগরিকদের সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম হলো সিটিজেন চার্টার। অথচ ময়মনসিংহের সরকারি দপ্তরগুলোতে এই চার্টারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দায়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, কাস্টমস-এক্সাইজ-ভ্যাট বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, ভূমি অফিস ও হাসপাতালসহ অন্তত ৪০টি সরকারি দপ্তরে সরেজমিন অনুসন্ধানে মাত্র পাঁচটি অফিসে সিটিজেন চার্টারের দেখা মিলেছে। যেসব দপ্তরে চার্টার রয়েছে, সেখানেও তথ্য অসম্পূর্ণ, হালনাগাদহীন কিংবা অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার তথ্য অনুপস্থিত।
সিটিজেন চার্টার কেবল একটি তথ্যবোর্ড নয়, বরং এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যকার সেবা প্রদানের একটি লিখিত প্রতিশ্রুতি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ‘মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থার সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেনস চার্টার) প্রণয়ন সংক্রান্ত নির্দেশিকা, ২০১৭’ অনুযায়ী, প্রতিটি দপ্তরে নাগরিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অভ্যন্তরীণ—এই তিন ধরনের সেবার কাঠামো থাকা বাধ্যতামূলক। এতে সেবার নাম, পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি, সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবি ও যোগাযোগের তথ্য থাকার কথা। কিন্তু ময়মনসিংহের অফিসগুলোতে এই মৌলিক তথ্যের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
সিটিজেন চার্টারের অনুপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সেবা নিতে আসা ফেরদৌসি বেগম জানান, তাকে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। কোথায় আবেদন করতে হবে বা কী কাগজ লাগবে, তা আগে থেকে জানার কোনো সুযোগ ছিল না। নগরীর সিনিয়র সিটিজেন সালিম হাসান মনে করেন, সেবার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে অন্ধকারে রাখলে দালালনির্ভরতা ও হয়রানি বাড়ে। এতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, কারণ নাগরিক জানেন না তার কাজের সরকারি খরচ কত বা কতদিনে তা সম্পন্ন হওয়ার কথা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগীয় কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাদের অফিসে সিটিজেন চার্টারের প্রয়োজন নেই। সড়ক ভবন ও গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়েও কোনো চার্টার পাওয়া যায়নি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী ফখরুল আলম জানান, তাদের ভবনে কোনো চার্টার নেই এবং তথ্যের জন্য তিনি ‘বড় স্যারদের’ সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। অথচ সিটিজেন চার্টারের মূল উদ্দেশ্যই হলো ব্যক্তিনির্ভরতা কমিয়ে তথ্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের অবস্থাও একই। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কের কর্মচারী আবু তাহের জানান, সেখানে কোনো চার্টার নেই এবং কেউ তা খোঁজেনও না। অন্যদিকে, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কে কর্মরত কনস্টেবল হোসনে আরা জানান, সিটিজেন চার্টার বা নাগরিক সেবা কী—তা তিনি জানেনই না।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো নাগরিক সেবা না পেলে বা অসন্তুষ্ট হলে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পর অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা (অনিক), এরপর আপিল কর্মকর্তা এবং প্রয়োজনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলে যাওয়ার বিধান রয়েছে। অনিকের কাছে অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস, আপিল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ২০ কার্যদিবস এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৬০ কার্যদিবস নির্ধারিত। কিন্তু অধিকাংশ অফিসে চার্টারই না থাকায় সাধারণ নাগরিক এসব অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ রয়ে গেছেন।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), ময়মনসিংহের সভাপতি শরীফুজ্জামান পরাগ বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন, নিয়মিত হালনাগাদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে অবহিত করা জরুরি। শুধু চার্টার প্রণয়ন নয়, সেখানে উল্লেখিত সেবা, সময়সীমা ও অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করলেই নাগরিকরা এর সুফল পাবেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, সিটিজেন চার্টার হলো নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের অলিখিত চুক্তি, যা প্রতিটি অফিসেই থাকা আবশ্যক। যেসব কার্যালয়ে চার্টার নেই, তা মনিটরিং করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হয়রানির পাশাপাশি বাড়ছে দালালনির্ভরতা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবার কোথাও চার্টার থাকলেও তা নাগরিকের চোখে পড়ার মতো স্থানে নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাধারণ মানুষের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বেশির ভাগ অফিসে চার্টার রাখা হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোথাও আবার চার্টারের ওপর পড়ে আছে ধুলোবালি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অফিসে স্পষ্টভাবে চার্টার থাকলে হয়তো অনেক কম ভোগান্তি হতো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ কারণে সহজ একটি কাজ করতেও তাকে বিভিন্নজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরকারি অফিসগুলো ঘুরে দেখা যায়, সিটিজেন চার্টারের অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের।