চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের দোরগোড়ায় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া সরকারের কোনো সাধারণ সেবা বা করুণা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত এক সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা বলেন। তিনি জানান, তীব্র পানি সংকটে থাকা এলাকাগুলোতে শুধু সরকারি উদ্যোগে সমাধান সম্ভব নয়; তাই সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে টেকসই পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মধ্যে তিন বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এই চুক্তির আওতায় নগরের ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে নতুন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মডেলে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে তা নগরের অন্যান্য এলাকা এবং দেশের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, পাইলট প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত এলাকাগুলোতে পানির সংকট এতটাই প্রকট যে সেখানে পানির অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার এককভাবে সব কাজ করতে পারে না। তাই প্রচলিত ব্যাংকঋণ বা একক সরকারি অর্থায়নের বাইরে গিয়ে পিপিপি মডেল গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সরকার ও বেসরকারি খাতের পাশাপাশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে যুক্ত হবে। তিনি আরও বলেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। নতুন এই মডেলে রক্ষণাবেক্ষণকে পুরো ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যায়।
জলাবদ্ধতা নিরসন ও খাল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, শুধু পানি সরবরাহ করলেই হবে না, বরং খাল ও জলপথগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। এগুলোকে আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এছাড়া জনগণের করের টাকার সঠিক ও অর্থপূর্ণ ব্যয় নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সমঝোতা স্মারক সইয়ের আগে গত মে মাসে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে একটি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় দেখা যায়, ওই দুই ওয়ার্ডের ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৯ জন বাসিন্দার নিরাপদ খাওয়ার পানি পাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। সেখানে মাত্র ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন পৌঁছেছে। ফলে অধিকাংশ বাসিন্দাকে বেসরকারি বিক্রেতাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ওই এলাকায় ৮৫ থেকে ১১৫ জন পানি বিক্রেতা রয়েছেন। বাসিন্দাদের প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার পানির জন্য ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ৬ হাজার পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন এবং বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ইয়ানা ভ্যান ডার লিন্ডেন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের পানি খাতে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, যা এখন টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পাইলট প্রকল্পটি কেবল শুরু। এর মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে চট্টগ্রামের সব পরিবারে নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, এই উদ্যোগে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলমান ‘বিল্ডিং ওয়াটার বিজনেস’ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে। এর আগে এই কর্মসূচির আওতায় পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনায় ১০৫টির বেশি পাইপলাইনের পানি সরবরাহব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এ টি এম তারিকুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সমঝোতা স্মারকের আওতায় ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রথমে পানির চাহিদা ও সেবার ঘাটতি নিরূপণ করা হবে। চাকরির আরও তথ্য: অনুমানের ভিত্তিতে বড় প্রকল্প নেওয়ার বদলে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আর্থিকভাবে টেকসই ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প তৈরি করাই লক্ষ্য।