নেপাল ও চীন সীমান্তে হিমালয়ের একটি হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। এই ভয়াবহ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ। গত ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপালের ল্যাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর দিক থেকে বরফ ও পাথরের একটি বিশাল খণ্ড ভেঙে পড়ে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল এই ঘটনাকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমোড) এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনা নিয়ে নিবিড় গবেষণা চালাচ্ছেন। তাদের তথ্যমতে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় এই ধস শুরু হয়েছিল। ভেঙে পড়া বরফ ও পাথরের খণ্ডটি ছিল এক কিলোমিটারের বেশি চওড়া এবং প্রায় ৭০০ মিটার লম্বা। এই বিশাল স্তূপ নিচে থাকা ধ্বংসাবশেষে ঢাকা একটি হিমবাহের ওপর আছড়ে পড়ে এবং লেন্দে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দেয়। পরে পানি ও ধ্বংসাবশেষের চাপে বাঁধ ভেঙে তীব্র বেগে নিচের দিকে নেমে আসে।
ইসিমোডের ভূতত্ত্ববিদ সুদান বিকাশ মহারজন জানান, মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে ধ্বংসাত্মক এই স্রোত ১ হাজার ৭০০ মিটার নিচে রাসুয়াগাড়িতে পৌঁছায়। প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এই স্রোতটি উচ্চতার পার্থক্যের কারণে বুলেট ট্রেনের মতো গতি অর্জন করেছিল। ধসের সময় প্রচুর আলগা মাটি ও পাথর যুক্ত হওয়ায় এটি আরও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করে। বর্তমানে নদীর গতিপথ আটকে দুটি হ্রদ তৈরি হয়েছে, যার একটির পানি নেমে গেলেও দ্বিতীয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন।
এই বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরা হিমালয়ের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের দিকে নজর দিচ্ছেন। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহ প্রায় ৪৫০ মিটার সংকুচিত হয়েছে, যার ফলে আগে বরফে ঢাকা থাকা পাথরগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তনের ফলে পাথরের ফাটলগুলো দুর্বল হয়ে পড়া এবং ফাটলের ভেতরে পানি ঢুকে ঢালকে ভঙ্গুর করে তোলাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ধসের ঠিক আগে কোনো ভূমিকম্প বা অস্বাভাবিক আবহাওয়ার নজির পাওয়া যায়নি।
জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়ের এই ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন ভূবিজ্ঞানী জ্যাকব স্টেইনার। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পাহাড় ধসে পড়া একটি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ারও অংশ। তিনি আরও জানান, বর্তমান বিশ্লেষণ অনুযায়ী নেপাল বা চীনের কর্তৃপক্ষের পক্ষে আগে থেকে এই ধসের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব ছিল না, কারণ ওই অঞ্চলে এমন অসংখ্য পাহাড় রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা এখন ২৬ আগস্টের ঘটনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করছেন। দুর্যোগবিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল এএফপিকে বলেন, এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সার্বক্ষণিক ও সুনির্দিষ্ট নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকার লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা এখন এই জ্ঞানকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ফলে উপত্যকার নিচের দিকে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ তীব্র বেগে ধেয়ে নামতে থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইসিমোডের তথ্য অনুযায়ী, ধসটি প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার (১৭ হাজার ৬০ ফুট) উচ্চতায় শুরু হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভেঙে পড়া অংশটি চওড়ায় এক কিলোমিটারের (০.৬ মাইল) বেশি এবং লম্বায় প্রায় ৭০০ মিটার ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হিমশিলার ওই স্তূপ প্রায় ৮০০ মিটার নিচে ধ্বংসাবশেষে ঢাকা একটি হিমবাহের ওপর আছড়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর এটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসার সময় লেন্দে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কিছুক্ষণের জন্য আটকে দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মহারজন বলেন, ‘খুব অল্প দূরত্বের মধ্যেই উচ্চতার ব্যবধান অনেক বেশি ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এত বিপুল পরিমাণ পানি কোথা থেকে এল, যার কারণে ধ্বংসস্তূপ এতটা দূরে ভেসে যেতে পেরেছে—বিশেষজ্ঞরা তা এখনো তদন্ত করে দেখছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।