চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সরকারি পর্যায়ে পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি এখন কেবল ঢাকা বা চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালের মতো বিভাগীয় শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গু সমান গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বর মাসে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৪০ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃতের সংখ্যা ১১০ জনে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১৬ হাজারের বেশি রোগী ঢাকা বিভাগের। উদ্বেগের বিষয় হলো, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই, অথচ সেখানেই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে স্বাস্থ্য খাতের ওপর এমনিতেই বাড়তি চাপ রয়েছে, তার ওপর ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা ২০১৯ ও ২০২৩ সালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষণা বলছে, এবার ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ ধরনটি প্রধান হয়ে উঠেছে, পাশাপাশি ডেন-২ ধরনটিও উল্লেখযোগ্য হারে ছড়াচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের পূর্বাভাস থাকলেও এডিস মশা নির্মূলে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এখনো মশা নিধনের সনাতন পদ্ধতি অর্থাৎ ওষুধ ছিটানোর মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যা মশার লার্ভা ধ্বংস করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ চললেও একটি কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত কৌশল গড়ে তুলতে না পারা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রস্তুতির কথা বললেও, রোগীদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটির চিত্র প্রমাণ করে যে বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়।
কেবল রোগী শনাক্ত বা চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরকারকে অবশ্যই জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে। নাগরিকদের জীবন রক্ষায় এখনই বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কতটা বিপর্যয়কর হতে পারে, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা তার বড় দৃষ্টান্ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১১০ জন রোগী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জুলাই মাস থেকেই ডেঙ্গুর সংক্রমণও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথমত, এখনো আমাদের মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নাগরিকদের মূল্যবান জীবন দিয়েই এই ব্যর্থতার মাশুল দিতে হচ্ছে।