জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় গণহত্যার যাবতীয় অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এই অভিযোগগুলোকে ‘এই শতাব্দীর সেরা মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বরং তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল গণহত্যা চালায়নি, বরং গণহত্যা প্রতিরোধ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করে তিনি ‘বর্বরদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও অংশীদারিত্বের জন্য ধন্যবাদ জানান। এরপর নেতানিয়াহু ইসরায়েলের যুদ্ধের “অষ্টম ফ্রন্ট”-এর প্রসঙ্গে আসেন। তিনি বলেন, তিনি হবেন জেরুজালেমের শাসক।
নেতানিয়াহুর ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে সভ্যতা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। গত বছর মার্কিন মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হওয়া চুক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বন্দিদশা থেকে জীবিত ও মৃত সকল বন্দিকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন। তিনি ইসরায়েলি নাগরিকদের সাহসের প্রশংসা করে বলেন, জাতি হিসেবে তারা কঠিন সংকটময় মুহূর্তে দলমত নির্বিশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে সক্ষম। আইডিএফ-কে বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, ‘ইসরায়েল হলো “একই ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা একটি জাতি—তা সে বামপন্থী বা ডানপন্থী, তরুণ বা প্রবীণ, ধর্মীয় কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ যে-ই হোক না কেন। সংকটময় মুহূর্তে ইতিহাসের শিক্ষা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং সাহসের জোরে ইসরায়েলিরা একসূত্রে গেঁথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়।
ইরানের সামরিক শক্তির দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু একটি কাল্পনিক দৃশ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যদি ইরানের একটি এক টনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে, তবে পুরো কম্পাউন্ডটি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এছাড়া তিনি দাবি করেন, গাজায় মানবিক সহায়তা হিসেবে ইসরায়েল বিপুল পরিমাণ খাদ্য সরবরাহ করেছে এবং বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অগণিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যদিও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা গাজায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা জানিয়ে খাদ্য সরবরাহের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তিনি বলেন, ‘আমি ইসরায়েলের জনগণের সাহসিকতাকে স্যালুট জানাই।
বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে কাতার ও তুরস্কের কঠোর সমালোচনা ছিল দৃশ্যমান। নেতানিয়াহুর অভিযোগ, কাতার হামাস নেতাদের আশ্রয় দেয় এবং আল জাজিরার মতো সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থায়নের মাধ্যমে ইসরায়েল বিরোধী ‘মিথ্যা’ প্রচার চালায়। একইসাথে তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানকে ‘স্বৈরাচারী’ সম্বোধন করে বলেন, তিনি কুর্দিদের হত্যা, সাইপ্রাস দখল এবং ইসরায়েল ধ্বংসের হুমকি দিয়ে চলেছেন। ৭ অক্টোবরের পর থেকে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে তুরস্ক ও ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে এবং অনেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা আঙ্কারাকে তাদের অঞ্চলের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখেন।
নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহারান মামদানির দিকে ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি জনবহুল এই শহরে এখন আর ইহুদিরা নিরাপদ নন। তিনি মামদানিকে হামাসপন্থী ও ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মেয়র এবং তার স্ত্রী ইসরায়েল বিরোধী অবস্থান নিয়ে কাজ করছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন যে, কোনো ধরনের হুমকি বা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তাকে সত্য বলার পথ থেকে সরাতে পারবে না।
ভাষণের শেষে ইহুদিদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, অতীতে অসহায় শিকার হিসেবে ইহুদিদের কসাইখানায় পাঠানোর দিন ফুরিয়ে গেছে। বর্তমানে ইসরায়েলের রাষ্ট্র এবং সেনাবাহিনী রয়েছে, যারা যেকোনো ধরনের বর্বরতার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। তিনি বাকি বিশ্বকে এই লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, তারা ইসরায়েল, আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বকে ঘৃণা করার জন্য তরুণদের মগজধোলাই করছে।